বাংলাদেশে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে অতিরিক্ত কর ও শুল্ক কাঠামো ডিজিটাল সংযোগ বিস্তার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
গ্লোবাল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্রন্টিয়ার ইকোনমিকস লিমিটেড ডিজিটাল অপারেটর ভিয়নের জন্য “বাংলাদেশ ডিজিটাল সংযোগে বাধা কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে” শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল খাতে করের বোঝা কমানো গেলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কর কাঠামোর চাপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ, যা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় ২০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। তবে সরকার রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, মোবাইল অপারেটরদের আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশই বিভিন্ন ধরনের কর, শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক ফি হিসেবে সরকারের কাছে চলে যায়। অর্থাৎ অপারেটরদের প্রতি ১ ডলার আয়ের মধ্যে ৫৫ সেন্টই রাজস্ব হিসেবে জমা দিতে হয়।
এছাড়া ভোক্তা ও অপারেটরদের ওপর বিক্রয়, ব্যবহার ও টার্নওভারভিত্তিক করের মোট হার দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশ, যেখানে দেশের সাধারণ ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল এবং ন্যূনতম টার্নওভার শর্ত যোগ হলে এই বোঝা আরও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে তালিকাভুক্ত নয় এমন মোবাইল অপারেটরদের করপোরেট করহার ৪৫ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ, যা অন্যান্য ব্যবসা খাতের তুলনায় অনেক বেশি।
স্মার্টফোন বিস্তারে ধীরগতি
প্রতিবেদনটি নতুন সিম সংযোগে আরোপিত ৩০০ টাকার করকেও সমালোচনা করেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘মোবাইল-ফার্স্ট’ অর্থনীতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই কর ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের বড় বাধা তৈরি করছে।
যদিও দেশে ৪জি নেটওয়ার্কের আওতা জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তবুও অপারেটরদের গড় মাসিক আয় বা এআরপিইউ নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ২ ডলারে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে অপারেটররা পিছিয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের গড় মোবাইল ডাউনলোড গতি ৪০ এমবিপিএস, যা ১০৫ দেশের মধ্যে ৯১তম অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতে স্মার্টফোন রয়েছে।

কর কমালে বাড়তে পারে প্রবৃদ্ধি
ফ্রন্টিয়ার ইকোনমিকসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মোবাইল খাতের কর সাধারণ অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা গেলে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটবে। গবেষণায় ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, রাজস্ব ভাগাভাগি ১ শতাংশে কমানো এবং সিম কর পুরোপুরি বাতিলের একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এই পরিবর্তন হলে গ্রাহকপ্রতি ডেটা ব্যবহার ৪ শতাংশ এবং মোবাইল ব্যবহারকারী সংখ্যা ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে, শুরুতে সরকারের রাজস্ব আয়ে কিছু ঘাটতি দেখা দিতে পারে। প্রথম বছরে এই ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৭৬১ মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে করভিত্তি সম্প্রসারিত হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা পূরণ হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণাটি স্মার্ট বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ডিজিটাল সংযোগের বাধা কমানো, মোবাইল ডেটার দাম কমানো এবং নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য প্রবেশ ব্যয় হ্রাসের সুপারিশ করেছে।
বাংলাদেশে মোবাইল খাতে উচ্চ কর ডিজিটাল অগ্রগতিতে বাধা
মোবাইল খাতে অতিরিক্ত কর ও শুল্ক কমালে ইন্টারনেট ব্যবহার, স্মার্টফোন বিস্তার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে নতুন গবেষণা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















