ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারককে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই সমঝোতা এখনও চূড়ান্ত নয়। আলোচনার ফলাফল তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প বলেন, বর্তমান সমঝোতা কেবল একটি প্রাথমিক চুক্তি। ইরান যদি শর্ত মেনে না চলে বা আলোচনায় অগ্রগতি না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
যুদ্ধ থামাতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ
ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-ব্যাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপানের নেতারা ইরান যুদ্ধ বন্ধে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা লেবাননে অবিলম্বে শক্তিশালী যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।

নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান জরুরি। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তাদের মতে, এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।
৬০ দিনের বিরতি, স্থায়ী চুক্তির লক্ষ্য
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া নতুন সমঝোতা যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আরও ৬০ দিন বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ স্থায়ী শান্তি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালাবে।
দীর্ঘ সংঘাতের ফলে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। তাই আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত স্থায়ী সমাধানের জন্য চাপ বাড়াচ্ছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিল, তার অনেকগুলোই এখনও অর্জিত হয়নি। ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বহাল রয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতও পুরোপুরি সরানো হয়নি। এছাড়া দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনও অব্যাহত রয়েছে।

লেবানন প্রশ্নে অনিশ্চয়তা
চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো লেবাননের ভবিষ্যৎ। ইসরায়েলি বাহিনী এখনও দক্ষিণ লেবাননের একটি বড় অংশে অবস্থান করছে। কয়েক মাসের সংঘাতে সেখানে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইরান বলছে, প্রকৃত যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে হলে লেবাননেও সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং বিদেশি বাহিনীকে সরে যেতে হবে। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করবে।
এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেও কিছু মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন পরিকল্পনা
জি-৭ নেতারা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ পথ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো জরুরি।

একই সঙ্গে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে এ বিষয়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে এই সমঝোতা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনও চ্যালেঞ্জে ভরা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি নয়, ইরান, লেবানন ও পুরো অঞ্চলে টেকসই রাজনৈতিক সমাধানই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















