বাংলাদেশজুড়ে শিশুদের ওপর নৃশংস সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার সাম্প্রতিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এই বর্বরতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের ওপর যে নৃশংস নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। এমন জায়গাতেও শিশুদের ওপর সহিংসতা হয়েছে, যেখানে তাদের নিরাপদ থাকার কথা ছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি শিশুর অধিকার রয়েছে নিরাপত্তা পাওয়ার—তা বাড়ি, স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মস্থল কিংবা সমাজের যেকোনো জায়গাতেই হোক।
শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন ও নৃশংস সহিংসতার যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা দেশের শিশু সুরক্ষা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে। তিনি মনে করেন, অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে এবং প্রতিরোধ, অভিযোগ গ্রহণ, শিশু-বান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা, বিচারপ্রক্রিয়া, সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তা ব্যবস্থায় থাকা ঘাটতিগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য মানসিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা ও বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও আরও শক্তিশালী করতে হবে।

নীরবতা সহিংসতা বাড়ায়
ইউনিসেফের প্রতিনিধি বলেন, সমাজ নীরব থাকলে সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ে। তাই শিশু, নারী, পরিবার ও সমাজের সদস্যদের নির্যাতন, সহিংসতা বা শোষণের ঘটনা রিপোর্ট করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এর কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে নির্যাতনের শিকার শিশুদের সহায়তা ও রেফারেল সেবা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, নির্যাতনের শিকার শিশু ও নারীদের মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া তাদের প্রতি আরেক ধরনের নির্যাতন। এসব তথ্য পুনরায় শেয়ার করা পরিবার ও বেঁচে থাকা মানুষদের ট্রমা আরও বাড়িয়ে দেয়।
জনসচেতনতা ও প্রতিবাদ
শিশু ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুক্রবার রাজধানীর পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারের ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দাবিতে এলাকাবাসী ও মানবাধিকারকর্মীরা রাস্তায় নামেন।
দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে গত ১৯ মে তার প্রতিবেশী সোহেল রানা ধর্ষণ, হত্যা ও শিরশ্ছেদ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রও সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও সামাজিক জবাবদিহির সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬ শিশু। ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার পর অন্তত ১৭ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা
বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইউনিসেফ বলছে, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে এখনই জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















