বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানা ধরনের ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন, শি কূটনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছেন। কেউ মনে করছেন, ট্রাম্প অস্থির ও অনির্দেশ্য আচরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল করেছেন। আবার অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ কোনো সমঝোতা জাপান ও তাইওয়ানের জন্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
কিন্তু এই ধরনের তাৎক্ষণিক মূল্যায়নের একটি বড় সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা কোনো একক সম্মেলন বা কূটনৈতিক ছবির মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয় নয়। এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যার ফল নির্ভর করবে বহু বছরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যের ওপর।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটন-বেইজিং দ্বন্দ্বকে নতুন ধরনের “মহাশক্তির প্রতিযোগিতা” হিসেবে দেখা যেতে পারে। উনিশ শতকে ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষ কিংবা পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ঠান্ডা যুদ্ধের মতোই এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী লড়াই। পার্থক্য হলো, এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জটিল—এখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য এবং কৌশলগত খনিজও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় বেইজিং সম্মেলনকে চূড়ান্ত মোড়বদল হিসেবে দেখার সুযোগ খুব কম। বরং এটি দীর্ঘ প্রতিযোগিতার একটি প্রাথমিক অধ্যায় মাত্র। বক্সিংয়ের ভাষায় বললে, এটি এখনো শুরুর রাউন্ড। দুই পক্ষই পরস্পরের শক্তি যাচাই করছে, সীমা পরীক্ষা করছে এবং ভবিষ্যৎ অবস্থান গড়ে তুলছে।
ইরান প্রশ্নে সীমিত চীনা প্রভাব
সম্মেলনের আগে কিছু পর্যবেক্ষক ধারণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনের ওপর চাপ দেবে যাতে বেইজিং ইরানকে প্রভাবিত করে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমায়। কিন্তু এই প্রত্যাশার পেছনে বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার অংশই বেশি।
চীনের পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবে সামরিক জোট এড়িয়ে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়লেও নিরাপত্তা কাঠামোতে তারা এখনো সরাসরি ভূমিকা নিতে অনাগ্রহী। ফলে ইরানের ওপর চীনের প্রভাব সীমিত। তেহরান নিজস্ব নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বকে অগ্রাধিকার দেয়; কেবল বেইজিংয়ের অনুরোধে তারা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত বদলাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
চীনও জানে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ইরান ইস্যুতে বড় ধরনের চীনা মধ্যস্থতার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণই থেকে যাচ্ছে।
‘ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব’ তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা
ট্রাম্প ও শির ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রায়ই শিকে “বন্ধু” বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যক্তিগত উষ্ণতা সবসময় বাস্তব আস্থার প্রতিফলন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি কূটনৈতিক ভাষা, যার উদ্দেশ্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া বা দরকষাকষির পরিবেশ তৈরি করা।
শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, তিনি ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেন। একইভাবে ট্রাম্পও সম্পর্কের ভাষা ব্যবহার করেন মূলত দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। ফলে “ব্যক্তিগত সম্পর্ক” দিয়ে দুই দেশের কাঠামোগত দ্বন্দ্ব মিটে যাবে—এমন ধারণা অত্যন্ত সরলীকৃত।
-6805c4fff1620.jpg)
অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় অচলাবস্থা
বৈঠকে অর্থনীতি, বাণিজ্য বা নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো মৌলিক অগ্রগতি দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র এখনো মনে করে, চীন বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বেইজিংও বিরল খনিজসহ বিভিন্ন কৌশলগত সম্পদকে চাপ সৃষ্টির উপায় হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।
গত কয়েক দশকে দুই দেশের মধ্যে বহু সংলাপ কাঠামো গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। মাঝে মাঝে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় অঙ্কের পণ্য কিনেছে, কিছু উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমেছে, কিন্তু মূল দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে একই জায়গায়।
নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বদলায়নি। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে তাইওয়ান প্রশ্ন আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। বেইজিং স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাইওয়ান ইস্যুতে তারা কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদ মেনে নেবে না। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনও তাইওয়ানের প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি থেকে সহজে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: ভুল হিসাব
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক সম্ভবত সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা নয়, বরং ভুল হিসাবের ঝুঁকি। যখন একটি উদীয়মান শক্তি মনে করতে শুরু করে যে তারা প্রতিদ্বন্দ্বীর সমকক্ষ হয়ে গেছে, তখন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা বাড়ে। একই সময়ে পুরোনো শক্তিও ভাবতে পারে, ভবিষ্যতে ভারসাম্য আরও বদলে যাওয়ার আগে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
ইতিহাসে বহু সংঘাত এই মনস্তত্ত্ব থেকেই জন্ম নিয়েছে। তাই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা যতটা প্রতিযোগিতার, ততটাই পারস্পরিক সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতার।
এ কারণেই বেইজিং সম্মেলনের মতো ঘটনাকে তাৎক্ষণিক বিজয়-পরাজয়ের কাঠামোয় বিচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এটি আসলে বহু বছরের এক ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষণিক দৃশ্য। শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ এগিয়ে যাবে, তা নির্ভর করবে কেবল নেতাদের ব্যক্তিত্বের ওপর নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামরিক ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক জোটব্যবস্থার পরিবর্তনের ওপর।
আজকের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক আর শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি নয়। এটি এমন এক দীর্ঘ প্রতিযোগিতা, যার প্রভাব পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে পারে।
কুনি মিয়াকে 



















