তাইওয়ান ইস্যুকে ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে জাপানের ওপর বিরল খনিজ রপ্তানি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে চীন। গত অন্তত চার মাস ধরে জাপানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হেভি রেয়ার আর্থ খনিজ ও গ্যালিয়ামের রপ্তানি স্থগিত রয়েছে বলে চীনা কাস্টমস তথ্য থেকে জানা গেছে। এতে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও চুম্বক উৎপাদন শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের বাইরে চীনের পর সবচেয়ে বড় রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট প্রস্তুতকারক দেশ জাপান। তবে ডিসপ্রোসিয়াম, টার্বিয়াম ও ইট্রিয়াম অক্সাইডের মতো হেভি রেয়ার আর্থ উপাদানের জন্য এখনও ব্যাপকভাবে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল টোকিও। একইভাবে চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ধাতু গ্যালিয়ামও চীন থেকেই আমদানি করে জাপান।
রপ্তানি কার্যত বন্ধ
চীনা কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে জাপানে ডিসপ্রোসিয়াম, টার্বিয়াম, ইট্রিয়াম অক্সাইড ও গ্যালিয়ামের রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। শুধুমাত্র খুব অল্প পরিমাণ ইট্রিয়াম পাঠানো হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জাপানের অন্যতম বড় ম্যাগনেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান শিন-এতসু ডিসপ্রোসিয়ামযুক্ত ম্যাগনেটের নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধ করেছে বলে এক পশ্চিমা ক্রেতা জানিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
তাইওয়ান উত্তেজনার প্রভাব
গত নভেম্বরে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ শুরু হওয়ার পরই এই রপ্তানি স্থবিরতা দেখা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং কৌশলগত খনিজ সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে এবার কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
চীন জানুয়ারিতে প্রকাশ্যে জাপানের বিরুদ্ধে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে। পরের মাসে আরও দুই দফা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, যার আওতায় পড়ে মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের জাহাজ নির্মাণ ও এয়ারো ইঞ্জিন বিভাগসহ বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো।

সংকট মোকাবিলায় জাপানের প্রস্তুতি
বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন জাপানের বাণিজ্যমন্ত্রী রিওসেই আকাজাওয়া। শনিবার তার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বিরোধ শুরুর পর তিনিই সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের জাপানি কর্মকর্তা হিসেবে চীন সফর করছেন।
জাপানের শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে সরকার মজুতকৃত খনিজ বাজারে ছাড়ার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। যদিও নিরাপত্তাজনিত কারণে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১০ সালে চীনের অনুরূপ রপ্তানি সীমিত করার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাপান আগেই কিছু প্রস্তুতি নিয়েছিল। সে সময় থেকেই দেশটি বড় আকারে মজুত গড়ে তোলে এবং বিকল্প প্রযুক্তি ও কম হেভি রেয়ার আর্থ ব্যবহারযোগ্য ম্যাগনেট তৈরির চেষ্টা শুরু করে।
বিকল্প উৎস খুঁজছে টোকিও
জাপান অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লিনাস রেয়ার আর্থসসহ বিকল্প উৎপাদকদের অর্থায়ন করেছে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি চীনের বাইরে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে পৃথক টার্বিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়াম উৎপাদন শুরু করে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সে রেয়ার আর্থ প্রকল্প এবং অস্ট্রেলিয়ায় গ্যালিয়াম প্রকল্পেও বিনিয়োগ করেছে টোকিও।
তবে বাস্তবতা হলো, চীনের সরবরাহ পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে লিনাস মাত্র ৮ মেট্রিক টন ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়াম উৎপাদন করেছে। অথচ ২০২৪ সালে চীন প্রতি মাসে গড়ে ১৪ টন এই দুই খনিজ জাপানে রপ্তানি করেছিল।
অন্যদিকে, গাড়ি ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত প্রস্তুত রেয়ার আর্থ ম্যাগনেটের স্বাভাবিক রপ্তানি এখনও চালিয়ে যাচ্ছে চীন। টিডিকে জানিয়েছে, আপাতত বড় ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা তারা দেখছে না এবং সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার কাজ চলছে। মিতসুবিশি মোটরসও ফেব্রুয়ারিতে জানায়, বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় রেয়ার আর্থ তারা নিশ্চিত করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















