মৃত সন্তানের স্মৃতি কি প্রযুক্তির মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব? আর যদি সম্ভবও হয়, তাহলে সেটি কি সত্যিই মানুষকে শোক কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে, নাকি আরও গভীর এক মানসিক সংকটে ঠেলে দেয়? জাপানের খ্যাতিমান নির্মাতা Hirokazu Kore-eda তাঁর নতুন সিনেমা ‘শিপ ইন দ্য বক্স’-এ ঠিক এই প্রশ্নগুলোকেই সামনে এনেছেন।
চলতি বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম দ’র প্রতিযোগিতায় থাকা এই সিনেমাটি আগামী ২৯ মে জাপানে মুক্তি পাচ্ছে। ‘শপলিফটার্স’-এর পর এই প্রথম আবার নিজস্ব জাপানি ভাষার মৌলিক চিত্রনাট্যে ফিরেছেন কোরে-এদা।
সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে এক দম্পতিকে ঘিরে, যারা দুই বছর আগে তাদের সাত বছর বয়সী সন্তানকে হারিয়েছে। ভবিষ্যতের এক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তারা এমন এক মানবসদৃশ শিশুকে ঘরে আনে, যে তাদের মৃত সন্তানের স্মৃতি, আচরণ ও ব্যক্তিত্বের অনেকটাই ধারণ করে। কিন্তু এই পুনর্মিলন ধীরে ধীরে তাদের শোক, ভালোবাসা ও বাস্তবতার ধারণাকে নাড়িয়ে দেয়।
প্রযুক্তির জাদু নাকি নৈতিক সংকট
কোরে-এদা জানিয়েছেন, সিনেমাটির ধারণা আসে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের খবর পড়ে, যারা জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে মৃত মানুষদের ডিজিটালভাবে পুনর্নির্মাণ করে। পরে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন। সেখানে তিনি এমন একটি মডেল দেখেন, যা মৃত ব্যক্তির ছবি, কণ্ঠ ও স্মৃতির ভিত্তিতে নতুন কথোপকথন চালাতে পারে।
এই প্রযুক্তি তাঁকে একই সঙ্গে মুগ্ধ ও উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁর মতে, শোকগ্রস্ত মানুষের কাছে এটি সাময়িক সান্ত্বনা হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে বিপজ্জনক নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। সেই দ্বন্দ্বই সিনেমার কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে উঠেছে।

মানুষ কি কল্পনা হারিয়ে ফেলছে?
সিনেমার নাম নেওয়া হয়েছে ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ থেকে। কোরে-এদার ভাষায়, মানুষ একসময় একটি বাক্সের ভেতরে কী আছে তা কল্পনা করতে পারত। এখন সেই কল্পনাশক্তি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, আর এআই হয়তো মানুষকেও পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে।
তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি যতই এগোক না কেন, মানুষের অনুভূতি, দ্বিধা, উদ্বেগ ও কল্পনাশক্তির জায়গাটি এখনও অনন্য। তাঁর প্রশ্ন, শুধুমাত্র ‘সঠিক উত্তর’ সংগ্রহ করে কি সত্যিকারের সৃজনশীলতা জন্ম নিতে পারে?
কোরে-এদা বলেন, মানুষ বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায় চিন্তা, সংশয় ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে। আর সেখানেই মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য রয়ে গেছে।
চলচ্চিত্র এখনো মানুষের শিল্প
চলচ্চিত্র নির্মাণে এআইয়ের বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়েও কথা বলেছেন এই নির্মাতা। তাঁর মতে, যদি কেবল দক্ষতা ও গতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সিনেমা ধীরে ধীরে একঘেয়ে ও যান্ত্রিক হয়ে পড়বে।
এ কারণেই তিনি এখনও ফিল্মে শুটিং করেন। তাঁর বিশ্বাস, একটি শুটিং সেটে যে মানবিক রসায়ন তৈরি হয়, সেটিই চলচ্চিত্রের আসল প্রাণ। বাইরে থেকে যেগুলো অপচয় মনে হয়, সেই সময়, বিরতি ও অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলোই একটি চলচ্চিত্রকে জীবন্ত করে তোলে।
সিনেমার শেষ দৃশ্যে দম্পতিকে দেখা যায় তাদের বাগানের গাছের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যাওয়া সন্তান ও নতুন মানবসদৃশ শিশুটিকে একই সঙ্গে কল্পনা করতে। প্রযুক্তির বাইরে গিয়ে সেই মুহূর্তটি দাঁড়িয়ে থাকে শুধুমাত্র মানুষের কল্পনাশক্তির ওপর। আর কোরে-এদার বিশ্বাস, প্রকৃত জাদু সেখানেই।
এআই যুগেও মানুষের কল্পনাশক্তি ও অনুভূতির গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে ‘শিপ ইন দ্য বক্স’। প্রযুক্তির বিস্ময়ের ভেতরেও মানুষ যে এখনও আবেগ, স্মৃতি ও কল্পনার প্রাণী— কোরে-এদার সিনেমা যেন সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















