মধ্য আফ্রিকার কঙ্গোতে আবারও ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে নতুন করে আতঙ্কে ফেলেছে। এবার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ভাইরাসটির বিরল একটি ধরন, যার বিরুদ্ধে এখনো অনুমোদিত কোনো টিকা বা দ্রুত শনাক্তকরণ পরীক্ষা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু আফ্রিকার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক মহামারির জন্যও একটি বড় সতর্কসংকেত।
গত কয়েক বছরে আফ্রিকায় ইবোলা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। জায়ের ধরনের ইবোলার বিরুদ্ধে টিকা, দ্রুত পরীক্ষা এবং রোগী আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা ভাইরাসটির বিস্তার কমাতে সাহায্য করে। স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও আস্থা বাড়াতেও সফল হয় বিভিন্ন সংস্থা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। নতুন প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বান্ডিবুগিও ধরনের ইবোলার বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো অনুমোদিত টিকা নেই। ফলে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে কয়েক মাস ধরে রোগটি অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে। কয়েক দিনের মধ্যেই সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬০০-তে পৌঁছে যায় এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৩৯ ছাড়িয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এটি ২০১৮ সালের ভয়াবহ ইবোলা সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেই সময় একই অঞ্চলে দুই হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।
টিকার জন্য দ্রুত উদ্যোগের দাবি
বর্তমানে দুটি সম্ভাবনাময় টিকা নিয়ে কাজ চলছে বলে জানানো হয়েছে। তবে সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তাই গবেষণা, উৎপাদন এবং সরবরাহে দ্রুত অর্থায়নের দাবি উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধনী দেশগুলোর সরকার যদি আগেই বড় পরিমাণ টিকা কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে ওষুধ কোম্পানিগুলো আরও দ্রুত কাজ করতে উৎসাহ পাবে।

সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল
গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় কঙ্গোর অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা হ্রাস পায়। ফলে রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সুরক্ষা সরঞ্জাম, চিকিৎসাকর্মী এবং জরুরি সহায়তার তীব্র সংকট রয়েছে। নতুন করে অর্থ সহায়তা না এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
রাজনৈতিক অস্থিরতাও বড় বাধা
পূর্ব কঙ্গো দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাত ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শতাধিক মিলিশিয়া গোষ্ঠী সেখানে সক্রিয়। অনেক এলাকায় সরকারের কার্যকর উপস্থিতিও নেই।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সরকারের দ্বন্দ্বের কারণে অনেক এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিমানবন্দর, ব্যাংক ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এই সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
ভবিষ্যৎ মহামারির বড় সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইবোলা করোনাভাইরাসের মতো বাতাসে ছড়ায় না, তাই এটি তুলনামূলক ধীরগতিতে সংক্রমিত হয়। তবুও এই সংকট বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি দুর্বল হলে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
ভাইরাস গবেষণা, জিনগত বিশ্লেষণ, রোগ পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কমে গেলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















