ভারতে টানা কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধির পরও পেট্রোল ও ডিজেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের জ্বালানি বাজারে।
গত দুই সপ্তাহে চারবার জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো। সর্বশেষ সোমবার পেট্রোলের দাম লিটারে ২ টাকা ৬১ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ২ টাকা ৭১ পয়সা বাড়ানো হয়। এর ফলে ১৫ মে থেকে এখন পর্যন্ত পেট্রোলের দাম মোট ৭ টাকা ৩৫ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ৭ টাকা ৫৩ পয়সা বেড়েছে।
দিল্লিতে এখন পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে ১০২ টাকা ১২ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ৯৫ টাকা ২০ পয়সায় পৌঁছেছে। চার বছরের মধ্যে এই প্রথম রাজধানীতে পেট্রোলের দাম ১০০ রুপি অতিক্রম করল।

হরমুজ প্রণালির প্রভাব
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। ইরান ও ওমানের মাঝের এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ভারত যেহেতু তার মোট তেল চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই এই রুটে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি দেশটির জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা বাড়ার পর হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধিই শেষ নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলো এখনও আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ শুরুর সময় এবং নির্বাচনী মৌসুমে দীর্ঘদিন দাম অপরিবর্তিত রাখায় তাদের বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যেখানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলার ছিল, সংঘাত তীব্র হওয়ার পর মার্চে তা প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। পরে কিছুটা কমলেও বাজার এখনও অস্থিতিশীল রয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ব্রেন্ট ক্রুড দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের নিচে না নামলে ভারতে আরও এক দফা জ্বালানির দাম বাড়তে পারে।
সরকারের আগাম ইঙ্গিত
ভারতের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি এর আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয় এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। গণপরিবহন ব্যবহার ও কারপুলিং বাড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।
অর্থনীতিবিদ উদয় কোটাকও সতর্ক করে বলেছেন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের জন্য আরও জটিল অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।
আলোচনায় কিছুটা আশার আলো
![]()
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে এখনো পুরোপুরি সমাধান না হওয়ায় তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
নিরাপত্তা ঝুঁকি, বীমা ব্যয় এবং নৌ উত্তেজনার কারণে অনেক জাহাজ এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না। ফলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তেল কোম্পানির মুনাফি নিয়েও বিতর্ক
এর মধ্যেই জ্বালানির দাম বাড়ানো নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কারণ ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল কোম্পানি—ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম ও হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম—২০২৫-২৬ অর্থবছরে সম্মিলিতভাবে ৭৭ হাজার কোটি রুপির বেশি মুনাফা করেছে।
তবে কোম্পানিগুলোর দাবি, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান খুচরা মূল্য এখনও পুরো খরচ সামাল দিতে পারছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















