কানাডার অন্টারিওতে সহায়ক মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে পেশাগত সীমা লঙ্ঘন, প্রোটোকল ভঙ্গ এবং রোগীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলেও তাকে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ঘটনাটি ঘিরে দেশজুড়ে নৈতিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সহায়ক মৃত্যুর আইন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্টারিওর চিকিৎসক ড. জেমস ম্যাকলিনের বিরুদ্ধে দুইটি পৃথক অভিযোগের তদন্ত চালায় প্রাদেশিক চিকিৎসক নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তদন্তে উঠে আসে, এক রোগীকে মৃত ঘোষণা করার পর তিনি স্থান ত্যাগ করেন, কিন্তু পরে সেই রোগী আবার শ্বাস নিতে শুরু করেন। পরে চিকিৎসক ফিরে এসে অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগ করে আবার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। তদন্তে বলা হয়, প্রয়োজনীয় ওষুধ খুঁজে না পাওয়ায় তিনি প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করেননি।
আরেকটি আলোচিত অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন ৪৫ বছর বয়সী থমাস ডিলন। দীর্ঘদিন ধরে ক্রোনস রোগে ভুগছিলেন তিনি। তবে পরিবারের দাবি, তার মানসিক অবস্থা, বিষণ্নতা, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং মাদকাসক্তির ইতিহাস বিবেচনায় নিলে তাকে সহায়ক মৃত্যুর অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল না।
কফিশপে মূল্যায়ন, শিল্প এলাকায় মৃত্যু
তদন্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ড. ম্যাকলিন থমাস ডিলনের সহায়ক মৃত্যুর যোগ্যতা মূল্যায়ন করেছিলেন একটি কফিশপের বাইরে বসে। পরে মৃত্যুর দিন তিনি নিজেই ডিলনকে গাড়িতে করে একটি শিল্প এলাকার ভবনে নিয়ে যান, যেখানে মৃতদেহ পরিবহনের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহৃত একটি কক্ষে সহায়ক মৃত্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
চিকিৎসক দাবি করেন, রোগীর ইচ্ছাতেই এই স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল এবং সেটি “সম্মানজনক পরিবেশ” ছিল। তবে তদন্ত কমিটি বলেছে, চিকিৎসকের আচরণ পেশাগত সীমারেখা অতিক্রম করেছে এবং এতে “প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি” তৈরি হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিতর্ক
থমাস ডিলনের বোন সারাহ ডিলন বলেন, মৃত্যুর দিন তার ভাইয়ের চোখ অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ছিল এবং তিনি স্পষ্টতই কোনো মাদক বা ওষুধের প্রভাবে ছিলেন। পরিবারের দাবি, তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং প্রকৃত চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা পেলে হয়তো এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না।
পরিবার আরও জানায়, কোভিড মহামারির সময় কাজ হারানো, একাকীত্ব এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা থমাসকে গভীর হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। একসময় তিনি মদ্যপান ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তবু নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলেছে, তার মানসিক সমস্যার ইতিহাস থাকলেও সেটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে বাতিল করে না।
তদন্ত কমিটির কড়া পর্যবেক্ষণ
অন্টারিওর প্রধান করোনার দপ্তরের বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি ঘটনাটি খতিয়ে দেখে জানায়, রোগীকে নিজে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত “জবরদস্তির সীমার কাছাকাছি” ছিল। কমিটি আরও উল্লেখ করে, রোগীর পরিবারকে যথেষ্টভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও আসক্তি সম্পর্কিত বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়নি।
তবুও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাকে সতর্কবার্তা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার কর্মস্থলে আকস্মিক পরিদর্শন এবং রোগীর নথি পর্যবেক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কানাডাজুড়ে নতুন বিতর্ক
২০১৬ সালে কানাডায় সহায়ক মৃত্যুকে বৈধতা দেওয়া হয়। পরে আইন আরও বিস্তৃত করা হয়, যাতে মৃত্যুপথযাত্রী না হলেও অসহনীয় যন্ত্রণায় থাকা রোগীরা এই সুবিধা নিতে পারেন। বর্তমানে শুধুমাত্র মানসিক অসুস্থতাকে ভিত্তি করে সহায়ক মৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে দেশটিতে তীব্র বিতর্ক চলছে।
থমাস ডিলনের ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। তার পরিবার বলছে, এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















