অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারকে দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে ভয়ংকর ক্যানসারের একটি হিসেবে ধরা হয়। এই রোগে আক্রান্তদের মাত্র ১৩ শতাংশ পাঁচ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এমন এক ক্যানসার, যা খুব দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসার সুযোগও সীমিত। তবে এবার সেই অন্ধকারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের আশার আলো। নতুন এক পরীক্ষামূলক ওষুধ রোগীদের জীবন প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন ওষুধে মিলছে ইতিবাচক ফল
সম্প্রতি পরীক্ষামূলক ওষুধ ‘ডারাক্সনরাসিব’ নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এই ওষুধ নিয়েছেন তারা গড়ে ১৩ মাস পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সাধারণ কেমোথেরাপিতে যেখানে সময়টা অনেক কম, সেখানে এই ফলাফলকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণাটি নিয়ে এখন চিকিৎসাবিশ্বে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ওষুধ মূলত ‘কেআরএএস’ নামে একটি পরিবর্তিত প্রোটিনকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। এই প্রোটিন অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন যে এটি রোগের প্রধান চালিকাশক্তি, কিন্তু এটিকে কার্যকরভাবে থামানোর মতো ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ প্রোটিনটির গঠন ছিল অত্যন্ত মসৃণ ও জটিল।
দশকের পর দশক গবেষণার ফল
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের গবেষণা, ব্যর্থতা ও নতুন নতুন পরীক্ষা। ২০০৮ সালে একদল গবেষক কেআরএএস নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করেন। পরে তারা এমন একটি অংশ খুঁজে পান, যেখানে ওষুধ কাজ করতে পারে। এরপর আরও গবেষণার মাধ্যমে তৈরি হয় নতুন ধরনের “মলিকুলার গ্লু” প্রযুক্তি, যা শরীরের ভেতরে গিয়ে কেআরএএস প্রোটিনকে আটকে দিতে সক্ষম হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের জন্য নয়, ভবিষ্যতে ফুসফুস ও কোলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসাতেও নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

এক মায়ের সংগ্রাম হয়ে উঠল অনুপ্রেরণা
এই গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক রোগীর বাস্তব জীবনের গল্পও। ২০২২ সালে চতুর্থ ধাপের অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হন দুই সন্তানের মা অ্যালিসন লাক। দীর্ঘ কেমোথেরাপির পর তিনি এই পরীক্ষামূলক ওষুধের ট্রায়ালে অংশ নেন। চিকিৎসার সময় তার শরীরে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও তিনি প্রায় এক বছর স্বাভাবিক জীবন কাটানোর সুযোগ পান। পরিবার নিয়ে বেড়াতে গেছেন, সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন এবং স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পেরেছেন।
২০২৫ সালে তিনি মারা গেলেও তার পরিবার মনে করছে, এই গবেষণায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যতের হাজারো রোগীর জন্য নতুন আশার পথ তৈরি করে গেছেন।
এখনও পুরো সমাধান নয়
চিকিৎসকরা স্পষ্ট করে বলছেন, এটি এখনই অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের পূর্ণ সমাধান নয়। এখনও জানতে হবে কেন একসময় ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায় এবং কীভাবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আরও কমানো যায়। তবে এতদিন যেখানে রোগীদের সামনে প্রায় কোনো কার্যকর বিকল্প ছিল না, সেখানে এই ওষুধকে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশা, ভবিষ্যতে যদি এই ওষুধ আরও উন্নত করা যায় এবং রোগের শুরুতেই ব্যবহার করা সম্ভব হয়, তাহলে রোগীদের জীবন আরও দীর্ঘ হতে পারে।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে নতুন ওষুধ ডারাক্সনরাসিব রোগীদের জীবন বাড়াচ্ছে দ্বিগুণ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তৈরি হয়েছে নতুন আশা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















