এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চজুড়ে আবারও শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা ঘনিয়ে আসছে। আবহাওয়াবিদদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে যে এটি গত দেড় শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে রূপ নিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ভারত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি এবং অর্থনীতির ওপর।
ফিলিপাইনের বোটোলান অঞ্চলের ধানচাষিরা ইতোমধ্যে উদ্বেগে রয়েছেন। সাধারণত মে মাসের শেষ দিকে মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হলেও এ বছর এখনো পর্যাপ্ত বৃষ্টি দেখা যায়নি। কৃষকদের আশঙ্কা, ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর মতো পরিস্থিতি আবারও ফিরে আসতে পারে, যখন খরায় ফসলি জমি ফেটে গিয়েছিল এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
শক্তিশালী এল নিনোর পূর্বাভাস
অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু গবেষকদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিকে সাধারণত শক্তিশালী বা অতিশক্তিশালী এল নিনো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই সময়ে এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা ৮২ শতাংশ। সেপ্টেম্বর নাগাদ এটি শক্তিশালী বা খুব শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য।
কৃষিতে বড় ধাক্কার শঙ্কা
ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ভারতের প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষিজমি এখনো বৃষ্টিনির্ভর। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জুন-সেপ্টেম্বর মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে।
মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা ইতোমধ্যে পরবর্তী মৌসুমে সয়াবিন নাকি তুলা চাষ করবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বৃষ্টির ঘাটতিই নয়, উচ্চ তাপমাত্রাও শস্য উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলবে। সবজি থেকে শুরু করে ডাল, তেলবীজ, শস্য এমনকি প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মালয়েশিয়ার ধানচাষিরাও বাড়তি সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও তারা নিজেদের ফসলের মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। একই সঙ্গে দেশটির কয়েকটি বড় জলাধারে পানির মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে এসেছে।

খাদ্যদাম ও অর্থনীতিতে প্রভাব
কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকা এশিয়ার ভোক্তাদের জন্য এটি নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। গবেষণাগুলো দেখায়, অতীতের বড় এল নিনো ঘটনাগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
খরার কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। পানিনির্ভর শিল্প, কারখানা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোও চাপে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত পানি না থাকলে তথ্যকেন্দ্রগুলোর শীতলীকরণ ব্যবস্থাও সমস্যায় পড়বে।

দাবানল ও পরিবেশগত ঝুঁকি
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় খরার সঙ্গে দাবানলের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অতীতে এল নিনোর সময় ব্যাপক বন ও পিটভূমির আগুন থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে জনস্বাস্থ্য, পরিবহন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
প্রস্তুতির চেষ্টা
সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। মালয়েশিয়া পানি ব্যবস্থাপনা ও রেশনিং পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইন্দোনেশিয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণ বাড়িয়েছে এবং প্রয়োজনে কৃত্রিম বৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি রাখছে। ভারতও জল সরবরাহ সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল ফসলের ব্যবহার বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে কৃষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ হলে এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে এ বছরের সম্ভাব্য এল নিনো শুধু আবহাওয়ার ঘটনা নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনোর হুমকিতে এশিয়ার কৃষি
শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কায় ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পানি সরবরাহ ও অর্থনীতি নতুন ঝুঁকির মুখে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















