ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক মিতব্যয়ী জীবনযাপনের আহ্বান দেশটির শহুরে মধ্যবিত্ত ও করদাতা শ্রেণির মধ্যে নতুন করে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে চাপ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সরকার জনগণকে খরচ কমানোর পরামর্শ দিলেও অনেকেই মনে করছেন এর মূল বোঝা এসে পড়ছে সেই শ্রেণির ওপর, যারা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে মোদি নাগরিকদের বাড়ি থেকে কাজ করা, জ্বালানি কম ব্যবহার করা, বিদেশ ভ্রমণ এড়ানো, দেশীয় পণ্য কেনা, সোনা কেনা স্থগিত রাখা এবং ভোজ্যতেল কম ব্যবহারের মতো বিভিন্ন পরামর্শ দেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
করদাতাদের বাড়তে থাকা হতাশা
ভারতের যে জনগোষ্ঠী নিয়মিত আয়কর দেয়, তাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। এই শ্রেণির মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের ঘাটতির অভিযোগ করে আসছে। তাদের অভিযোগ, বিপুল কর দেওয়ার পরও তারা মানসম্মত সরকারি সেবা পাচ্ছেন না।
অনেকের মতে, সরকার বিভিন্ন নির্বাচনে ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, অথচ করদাতাদের প্রত্যাশা ও স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে নতুন এই মিতব্যয়ী আহ্বান তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
‘ভালো দিনের’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন
নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন উন্নত অর্থনীতি ও সমৃদ্ধ জীবনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তাঁর জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ‘ভালো দিন’। সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করেছিল যে ভারত অতীতের বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভোগ্যপণ্যের ঘাটতির যুগ থেকে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন জনগণকে খরচ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তখন অনেকের কাছে এটি অতীতের সংকটময় সময়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব এবং মূল্যস্ফীতির চাপ এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিদেশ ভ্রমণ কর নিয়ে বিতর্ক
সরকারি মহলে বিদেশ ভ্রমণের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের চিন্তাভাবনা চলছে—এমন খবর প্রকাশের পর সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে সরকার দ্রুত সেই খবর অস্বীকার করে। তবে সমালোচকদের মতে, এমন আলোচনা থেকেই বোঝা যায় অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সরকার নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজছে।
অর্থনীতি ও রাজনীতির নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের করদাতা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জাতীয় মর্যাদা এবং স্থিতিশীলতার বিনিময়ে নানা সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছে। কিন্তু যখন তাদের জীবনযাত্রার মান সরাসরি প্রভাবিত হতে শুরু করে, তখন সেই সমর্থনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠছে। সরকার কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবে এবং করদাতা শ্রেণির আস্থা ধরে রাখবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















