পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরের সময়ে দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে একটি “গুরুতর ভুল” করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য বাবুল সুপ্রিয়। তবে একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এই মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।
বুধবার রাতে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত দীর্ঘ এক পোস্টে বাবুল সুপ্রিয় প্রথমে দলত্যাগী জনপ্রতিনিধিদের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, কোনো সাংসদ বা বিধায়ক যদি দলের প্রতীক, নেতৃত্ব ও সংগঠনের শক্তিতে নির্বাচিত হওয়ার পর দল ছেড়ে যান, তাহলে তাঁর নির্বাচিত পদ থেকেও পদত্যাগ করা উচিত।
দল বদল ও নৈতিকতার প্রশ্ন
বাবুল সুপ্রিয় লিখেছেন, রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যেতেই পারে এবং তিনি নিজেও অতীতে তা করেছেন। কিন্তু সেই অবস্থানকে সম্মান জানাতে হলে সাংসদ বা বিধায়কের পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত। নিজের উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, বিজেপি ছাড়ার পর তিনি লোকসভার সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগ করেছিলেন।
তার মতে, নির্বাচিত পদ ব্যক্তিগত নয়; সেটি অনেকাংশে দলের সমর্থন ও ভোটারদের আস্থার ফল। তাই দলত্যাগের পর পদে বহাল থাকা নৈতিকতার প্রশ্ন তৈরি করে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শুরুতেই’ কঠোরতার অভাব
পোস্টের সবচেয়ে আলোচিত অংশে বাবুল সুপ্রিয় দাবি করেন, তৃণমূল সরকারের শুরুর দিনগুলোতেই যাঁরা দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
তার ভাষায়, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এত জটিল পর্যায়ে পৌঁছাত না। তিনি মনে করেন, শুরুতে কঠোর অবস্থান না নেওয়ার কারণেই পরবর্তীকালে সমস্যা আরও গভীর হয়েছে।
‘৬০’ প্রসঙ্গ ঘিরে জল্পনা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যে তিনি “৬০” নামে একটি গোষ্ঠীর উল্লেখ করেন। যদিও তিনি স্পষ্ট করে কারা এই গোষ্ঠীর সদস্য তা জানাননি, তবু মন্তব্যটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যে ৬০ জন বিধায়কের একটি অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে। বাবুল সুপ্রিয়র মন্তব্য সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, সেই সময়ের কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি পরে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, আবার কেউ কেউ কারাগারেও গেছেন।
রহস্যময় মন্তব্যে নতুন বিতর্ক
পোস্টের এক পর্যায়ে তিনি এমন একজন ব্যক্তির প্রসঙ্গ তোলেন, যিনি তাঁকে গভীরভাবে হতাশ করেছেন। তিনি লেখেন, মানুষের ছদ্মবেশে একটি সাপ তাদের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে—এমনটা তিনি কখনও কল্পনাও করেননি।
তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় তিনি প্রকাশ করেননি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে মন্তব্যটির লক্ষ্য কে, তা নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
বিজেপিকেও সতর্কবার্তা
বাবুল সুপ্রিয় তাঁর পোস্টে বিজেপির প্রতিও পরোক্ষ বার্তা দেন। বিভিন্ন রাজ্যে অন্য দল থেকে নেতাদের দলে টেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুল না করার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বাস্তব রাজনীতিতে অনেক সময় এমন ধারণা কাজ করে যে প্রেম ও যুদ্ধে সবকিছুই ন্যায্য।
পোস্টের শেষ অংশে সম্ভাব্য বিতর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের সদস্যদের ব্যক্তিগত মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত হলেও তিনি সবসময় নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী কথা বলেছেন। তাই তাঁর এই মন্তব্যগুলোকে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবেই দেখা উচিত।
তৃণমূলের একজন বর্তমান সাংসদের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে দল যখন অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও দুর্নীতি-সংক্রান্ত বিতর্কের মুখোমুখি, তখন বাবুল সুপ্রিয়র এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















