বিশ্বজুড়ে যখন সীমান্ত আরও কঠোর হচ্ছে, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে এবং জাতীয় পরিচয়কে ঘিরে বিভাজন গভীরতর হচ্ছে, তখন ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়। এটি এমন এক আয়না, যেখানে দেশগুলো নিজেদের সম্পর্কে একটি গল্প বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই অর্থে কানাডার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই টুর্নামেন্ট দেশটির স্টেডিয়াম, অবকাঠামো কিংবা আয়োজক সক্ষমতার চেয়ে অনেক বড় একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে—বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠনের দীর্ঘ পরীক্ষায় কানাডার সাফল্য।
কানাডা আজ নানা সমস্যার মুখোমুখি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, রাজনৈতিক অসন্তোষও কম নয়। তবু এসব বাস্তবতার মাঝেও দেশটির একটি অর্জন বিশেষভাবে চোখে পড়ে: বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের জন্য একটি কার্যকর নাগরিক পরিসর তৈরি করা। এমন এক সমাজ, যেখানে ভিন্ন ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষ কেবল পাশাপাশি বাস করে না, বরং একটি অভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্ট এই বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তোলে। সাধারণত জাতীয়তাবাদকে আমরা বিভাজনের উৎস হিসেবে দেখি। কিন্তু খেলাধুলা প্রায়ই তার একটি ভিন্ন সংস্করণ উপস্থাপন করে। এখানে মানুষ নিজেদের দেশকে সমর্থন করে, আবার প্রতিপক্ষের প্রতিভাকেও সম্মান জানায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, কিন্তু তা সহিংসতার ভাষায় নয়; উৎসবের ভাষায়। এই কারণেই বিশ্বকাপ এমন একটি বিরল আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান, যেখানে জাতীয় পরিচয় ও বৈশ্বিক সংযোগ একই মঞ্চে সহাবস্থান করতে পারে।
কানাডার বড় শহরগুলো এই ধারণার বাস্তব উদাহরণ। সেখানে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, যাদের ইতিহাস একাধিক মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত। কেউ আফ্রিকার শরণার্থী শিবির থেকে যাত্রা শুরু করেছে, কেউ দক্ষিণ আমেরিকায় বেড়ে উঠেছে, কেউ এশিয়া থেকে নতুন জীবন খুঁজতে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সবাই একটি নতুন নাগরিক পরিচয়ের অংশ হয়েছে। বিশ্বকাপের সময় এই বৈচিত্র্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাস্তায় একসঙ্গে উড়তে থাকে অসংখ্য দেশের পতাকা, অথচ সেই উদ্যাপন স্থানীয় সমাজকে বিভক্ত না করে বরং আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
অবশ্য এই গল্পকে নিখুঁত সাফল্যের কাহিনি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কানাডার ইতিহাসে বর্ণবাদ, বৈষম্য এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণের বহু অধ্যায় রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ঘৃণাজনিত অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। অভিবাসন নীতির সমালোচনাও বেড়েছে। অর্থাৎ বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠন কোনো সরল বা নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়। এটি সবসময় রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক ভুল এবং সামাজিক উত্তেজনার মধ্য দিয়েই এগোয়।

তবু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কানাডায় এখনো ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন মূলধারায় পরিণত হয়নি। বহু পশ্চিমা দেশে যেখানে অভিবাসন প্রশ্নটি রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রে চলে গেছে, সেখানে কানাডা তুলনামূলকভাবে একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে যে দেশটি নাগরিকত্বকে রক্তের সম্পর্ক বা বংশগত পরিচয়ের বদলে অংশগ্রহণ, আইন এবং অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সত্যও রয়েছে। অভিবাসীদের সন্তানরা সাধারণত নতুন সমাজের সঙ্গে দ্রুত মিশে যায়। তারা নতুন ভাষা শেখে, স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয় এবং একই সঙ্গে পারিবারিক ঐতিহ্যের কিছু অংশও ধরে রাখে। ফলে পরিচয় একটি শূন্য-সম প্রতিযোগিতায় পরিণত হয় না। কেউ নিজের পূর্বপুরুষের সংস্কৃতিকে সম্মান করলেই যে নতুন দেশের প্রতি আনুগত্য হারাবে, বাস্তব অভিজ্ঞতা তা সমর্থন করে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দুই পরিচয় পরস্পরকে শক্তিশালী করে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক দশক আগে বিশ্বায়নকে মানবজাতির মিলনের পথ হিসেবে কল্পনা করা হতো। পরে সেই আশাবাদ অনেকটাই ম্লান হয়েছে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ বাড়লেও জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সাংস্কৃতিক উদ্বেগ কমেনি। ফলে অনেকে মনে করেন, বৈচিত্র্য ও সামাজিক সংহতির মধ্যে স্থায়ী সমন্বয় সম্ভব নয়।
কানাডার অভিজ্ঞতা অন্তত আংশিকভাবে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি প্রমাণ করে না যে সব সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু এটি দেখায় যে ভিন্ন পটভূমির মানুষকে একটি সাধারণ নাগরিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা অসম্ভব নয়। বিশ্বকাপের উৎসব সেই বাস্তবতার প্রতীকী প্রকাশ মাত্র।
তাই এই টুর্নামেন্টকে শুধুমাত্র ফুটবলের চোখে দেখলে তার বড় অর্থটি অধরা থেকে যাবে। মাঠে গোল হবে, দল জিতবে-হারবে, দর্শক উল্লাস করবে। কিন্তু মাঠের বাইরে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্য চলবে—একটি সমাজ নিজেকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে এমন এক উদাহরণ হিসেবে, যেখানে বৈচিত্র্যকে ভয় নয়, শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়। আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে এই বার্তাটির মূল্য হয়তো যেকোনো ট্রফির চেয়েও বেশি।
মার্কাস গি 



















