গত কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে যে বিনিয়োগ-উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তা শুধু প্রযুক্তি খাতকেই নয়, পুরো মার্কিন শেয়ারবাজারকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। বহু বিনিয়োগকারীর কাছে এআই যেন এমন এক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, যার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত হিসাব-নিকাশ আর প্রযোজ্য নয়। কিন্তু বাজারের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, কোনো উত্থানই অনন্তকাল স্থায়ী হয় না। প্রশ্ন কেবল একটাই—কোন শক্তি এসে সেই গতিকে থামাবে?
সাম্প্রতিক বাজার প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেই শক্তি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং তার সুদের হার নীতি।
সাধারণত শক্তিশালী কর্মসংস্থান তথ্য অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়। বেশি চাকরি মানে বেশি আয়, বেশি ভোগব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত করপোরেট মুনাফার সম্ভাব্য বৃদ্ধি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। প্রত্যাশার তুলনায় অনেক শক্তিশালী শ্রমবাজারের তথ্য প্রকাশের পর প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়।
এই আপাতবিরোধী প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা বাজারের মানসিকতায় লুকিয়ে আছে। বিনিয়োগকারীরা শক্তিশালী অর্থনৈতিক তথ্যকে আর কেবল প্রবৃদ্ধির বার্তা হিসেবে দেখছেন না; তারা এটিকে ভবিষ্যৎ সুদবৃদ্ধির পূর্বাভাস হিসেবেও পড়ছেন। অর্থাৎ ভালো অর্থনৈতিক খবর বাজারের জন্য খারাপ খবর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এআই-নির্ভর শেয়ারবাজারের উত্থান এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন অর্থের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সস্তা অর্থ, বিপুল তারল্য এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির আশাবাদ একত্রে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মূল্যায়নকে অস্বাভাবিকভাবে উঁচুতে নিয়ে গেছে। কিন্তু সুদের হার বাড়তে শুরু করলে সেই সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। কারণ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আয়ের বর্তমান মূল্য তখন কমে আসে, আর উচ্চ মূল্যায়নের পেছনের যুক্তিগুলো দুর্বল হতে থাকে।
এরই মধ্যে এআই অবকাঠামোতে ব্যয়ের পরিমাণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আগামী কয়েক বছরে বিপুল অঙ্কের মূলধনী বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এসব ব্যয় যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই বিপুল ব্যয় থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক রিটার্ন আদৌ আসবে কি?
প্রযুক্তি শিল্পের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনো নতুন প্রযুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ শুরুতে বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়। বর্তমান এআই ঢেউ সেই ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।
![]()
এদিকে সম্ভাব্য নতুন শেয়ারবাজার তালিকাভুক্তিগুলোর মূল্যায়নও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। কিছু বহুল আলোচিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বাজারমূল্য তাদের বর্তমান আয়ের তুলনায় এতটাই বড় যে অনেক বিশ্লেষক এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অবশ্যই এসব প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আর বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা দরকার। সেই ভারসাম্য যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন বাজারে বুদবুদের আশঙ্কা বাড়তে থাকে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাজারের একটি অংশ ক্রমশ মৌলিক আর্থিক সূচক থেকে বিচ্ছিন্ন আচরণ করছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক ফলাফলের চেয়ে কখনও কখনও একটি মন্তব্য, একটি ঘোষণা কিংবা একটি জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের প্রশংসাই শেয়ারের দামে নাটকীয় পরিবর্তন এনে দিচ্ছে। এই ধরনের আচরণ সাধারণত এমন সময়েই বেশি দেখা যায়, যখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুযোগ হারানোর ভয় যুক্তির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বাজার বিশ্লেষকদের বিভিন্ন ঝুঁকি সূচকও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। মূল্যায়ন, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব, মূলধনী ব্যয়, তহবিল প্রবাহ এবং করপোরেট আয়ের প্রত্যাশা—এসব সূচকের অনেকগুলোই এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অতীতের বড় বাজার সংশোধনের আগে দেখা গিয়েছিল। পরিস্থিতি এখনো দুই হাজার সালের ডট-কম ধস বা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেনি, কিন্তু ঝুঁকির মাত্রা যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তবে বাজার পতনের জন্য একটি মাত্র কারণ সাধারণত যথেষ্ট হয় না। ইতিহাস বলছে, অতিরিক্ত মূল্যায়ন, অতিরিক্ত আশাবাদ, উচ্চ ঝুঁকি গ্রহণ এবং নীতিগত পরিবর্তন—এসব একসঙ্গে মিলেই বড় সংশোধনের পথ তৈরি করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদের হার সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার সবচেয়ে সম্ভাব্য উপাদান বলে মনে হচ্ছে।
মার্কিন অর্থনীতিতে শ্রমবাজার এখনো দৃঢ়, মূল্যস্ফীতিও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে নীতিনির্ধারকদের ওপর সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে রাখার চাপ বজায় রয়েছে। বাজারও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতাকে মূল্যায়নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করছে।
এআই যে অর্থনীতি ও ব্যবসার ভবিষ্যৎকে বদলে দেবে, সে বিষয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ আছে। কিন্তু একটি প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এবং সেই প্রযুক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শেয়ারবাজারের মূল্যায়ন—দুটি বিষয় এক নয়। ইতিহাসের প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবই শেষ পর্যন্ত বাস্তব আয়, নগদ প্রবাহ এবং মুনাফার পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।
আজকের এআই উচ্ছ্বাসও তার ব্যতিক্রম হবে না। আর যদি অর্থের দাম সত্যিই বাড়তে থাকে, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গল্প যতই শক্তিশালী হোক না কেন, বাজারের বাস্তবতা হয়তো বিনিয়োগকারীদের আরও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
জেমি ম্যাকগিভার 



















