ডিজিটাল নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সত্যিকারের এলোমেলো সংখ্যা তৈরি করা। অনলাইন লেনদেন, তথ্য সুরক্ষা এবং গোপন যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো মূলত এই এলোমেলো সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সংখ্যা পুরোপুরি এলোমেলো হয় না, ফলে দক্ষ হামলাকারীরা সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছেন, যা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্যে তুলনামূলক দুর্বল ও পক্ষপাতযুক্ত এলোমেলো তথ্যকে প্রায় নিখুঁত এলোমেলো সংখ্যায় রূপান্তর করতে সক্ষম। গবেষকদের মতে, এটি ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এলোমেলো সংখ্যা কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিটি নিরাপদ অনলাইন ব্যবস্থা মূলত গোপন সংকেত বা নিরাপত্তা চাবির ওপর নির্ভর করে। এই চাবি যত বেশি এলোমেলো হবে, সেটি ভাঙা তত কঠিন হবে। কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে তৈরি অনেক এলোমেলো সংখ্যার মধ্যেই সূক্ষ্ম ধরণের পূর্বানুমানযোগ্যতা থেকে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা দেখিয়ে আসছেন যে, যদি কোনো উৎসে সামান্য পক্ষপাতও থাকে, তাহলে শুধুমাত্র প্রচলিত গণনাপদ্ধতি ব্যবহার করে তাকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ বা নিখুঁত এলোমেলোতায় রূপান্তর করা সম্ভব নয়।
কোয়ান্টাম জগতের সুবিধা
গবেষকরা এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে কোয়ান্টাম জড়তার একটি বিশেষ পরীক্ষা ব্যবহার করেছেন। কোয়ান্টাম জগতে কোনো কণাকে পরিমাপ করার মুহূর্তে নতুন তথ্য সৃষ্টি হয়, যা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে তারা অতিরিক্ত এলোমেলো তথ্য তৈরি করেন।
পরীক্ষায় দুটি জড়িত কণাকে আলাদা স্থানে রেখে তাদের ওপর বিভিন্ন পরিমাপ চালানো হয়। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কণাগুলোর আচরণ প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের সীমা অতিক্রম করেছে, যা কোয়ান্টাম প্রভাবের শক্তিশালী উপস্থিতি নির্দেশ করে।

কোটি কোটি তথ্য থেকে নিখুঁত ফল
গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে শত কোটি পক্ষপাতযুক্ত তথ্য এবং কোয়ান্টাম পরিমাপ থেকে পাওয়া আরও বিপুল পরিমাণ তথ্য। বিশেষ গাণিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে এই দুটি উৎসকে একত্র করা হয়। ফলে পৃথক উৎসগুলোর দুর্বলতা অনেকাংশে বাতিল হয়ে যায় এবং তৈরি হয় উচ্চমানের এলোমেলো সংখ্যা।
গবেষকদের দাবি, উৎপাদিত সংখ্যাগুলোর এলোমেলোতা যাচাইযোগ্য এবং অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার নির্ভরযোগ্য। এমনকি যন্ত্র নির্মাতার ওপর পুরোপুরি আস্থা না থাকলেও ফলাফলের এলোমেলোতা যাচাই করা সম্ভব।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ব্যবহার
এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আর্থিক লেনদেন, সামরিক যোগাযোগ, ব্লকচেইনভিত্তিক ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যাচাইকৃত এলোমেলো সংখ্যা সরবরাহকারী উন্মুক্ত সেবা গড়ে তুলতেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তিটি এখনও গবেষণাগার পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমান বাণিজ্যিক ব্যবস্থার তুলনায় এর গতি অনেক কম এবং পরিচালনাও জটিল। তাই নিকট ভবিষ্যতে প্রচলিত এলোমেলো সংখ্যা উৎপাদককে এটি পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
নতুন যুগের সূচনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্বল এলোমেলো উৎস থেকে কোয়ান্টাম পদ্ধতিতে উন্নত মানের এলোমেলো সংখ্যা তৈরি করা সম্ভব—এটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করা গেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার ভবিষ্যৎ উন্নয়নে এই অর্জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















