লেবাননের ঐতিহাসিক উপকূলীয় শহর টাইরে নতুন করে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বোমাবর্ষণে অন্তত আটজন নিহত এবং ৩২ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রামেও হামলা চালানো হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে যখন শহরের পুরোনো খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকায় জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়।
মঙ্গলবার সকালে কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই টাইরের আল-মাসাকেন এলাকায় হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের পর ঘন ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরে যায়। পরে শহরের আরও কয়েকটি অংশে এবং উত্তরের আব্বাসিয়েহ গ্রামেও নতুন করে হামলা হয়।
আতঙ্কে এলাকা ছাড়ছে বাসিন্দারা
হামলার পর ইসরায়েলি বাহিনী টাইরের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির এবং ঐতিহাসিক খ্রিস্টান এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। তাদের দাবি, ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর সদস্যরা প্রবেশ করেছে এবং সেখান থেকে হামলার ঝুঁকি রয়েছে।

নির্দেশ পাওয়ার পর শত শত মানুষ এলাকা ছাড়তে শুরু করেন। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ভরা গাড়িতে শহরের সরু রাস্তাগুলো দ্রুত ভিড়ে পরিণত হয়। আগে কখনও এই এলাকায় হামলা হয়নি বলে অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় সেখানে বসবাস শুরু করেছিল।
খ্রিস্টান নেতাদের উদ্বেগ
টাইরের তিনটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং লেবানন সরকারের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, পুরোনো শহরাঞ্চল শুধু একটি আবাসিক এলাকা নয়, এটি টাইরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানবিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই এলাকায় হামলা হলে তা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এখানে হাজারো সাধারণ মানুষ, শিশু, নারী ও বয়স্ক নাগরিক বসবাস করছেন।
ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের ক্ষতি
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নগরী হিসেবে পরিচিত টাইর বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার আবাসস্থল। শহরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সাম্প্রতিক হামলায় প্রাচীন রোমান ধ্বংসাবশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগের হামলাগুলোতেও বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতির মুখে পড়ে।

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে বিশেষ সুরক্ষা চিহ্ন বসানো হয়েছিল। তবুও চলমান সংঘাতের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংঘাতের বিস্তার ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
চলমান সংঘাতের মধ্যে হিজবুল্লাহও দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার দাবি করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা চালানো এক বন্দুকধারীকে তারা হত্যা করেছে।
মার্চ মাসের শুরু থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত ধীরে ধীরে বড় আকার নিয়েছে। এতে লেবাননে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলও সামরিক ও বেসামরিক হতাহতের মুখোমুখি হয়েছে।
সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধু লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















