০৬:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর: পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর আনন্দের ভারসাম্য কীভাবে রাখবেন পরীক্ষা ছাড়াই নজরকাড়া সাফল্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ-লেভেলে শতভাগ পাস ৫০ দশমিক ৯ ডিগ্রির দহনজ্বালার মাঝেই শারজাহে ঝড়-বৃষ্টি, আমিরাতে আবহাওয়ার নাটকীয় রূপ উপসাগরীয় অঞ্চলে ফ্লাইটে বড় পরিবর্তন, ভারতগামী যাত্রীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ হরমুজ ঘিরে নতুন উত্তেজনা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি—মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে সংঘাতের শঙ্কা ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সেপ্টেম্বরে যাচ্ছেন দিল্লি, ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন বিসিআই চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করলো ককরোচ জনতা পার্টি স্বাধীনতা দিবসের আগে দিল্লি হাইকোর্টসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা হামলার হুমকি যুদ্ধ শেষ হলেও ইরানের হুমকি কাটেনি, তুরস্ক থেকে গোপনে সরানো হয়েছিল ট্রাম্পকে ডারউইন টেস্টে তানজিদের প্রথম সেঞ্চুরি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চালকের আসনে বাংলাদেশ

আরোগ্যের বাজার: সুস্থতা যখন পণ্যে পরিণত হয়

দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক জীবন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, দ্রুতগতির কর্মসংস্কৃতি এবং প্রতিযোগিতার চাপ; অন্যদিকে ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ এবং এক ধরনের গভীর সামাজিক শ্রান্তি। দীর্ঘদিন ধরে এই চাপকে উন্নতির মূল্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন মানুষ সেই মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। ফলে বিশ্রাম, মানসিক শান্তি এবং ব্যক্তিগত সুস্থতার অনুসন্ধান ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এই অনুসন্ধানের একটি অস্বস্তিকর দিকও রয়েছে: আরোগ্য কি সত্যিই জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, নাকি সেটিও আরেকটি ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে?

আজকের কোরিয়ায় ‘হিলিং’ বা সুস্থতা শুধু একটি ধারণা নয়; এটি একটি বাজার। খাবারের বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পর্যটন শিল্প, জীবনধারা-বিষয়ক পণ্য—সবখানেই আরোগ্যের প্রতিশ্রুতি। এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে বিশ্রামও যেন পরিকল্পনা করে কিনে নিতে হয়। মানুষকে বলা হচ্ছে, সঠিক পানীয়, সঠিক সম্পূরক, সঠিক রিট্রিট কিংবা সঠিক অভিজ্ঞতা বেছে নিলেই জীবনের চাপ কমে যাবে। অথচ প্রশ্ন হলো, সমস্যার উৎস অপরিবর্তিত রেখে কি সত্যিই সমাধান সম্ভব?

এখানে মূল সংকট মানুষের বিশ্রাম খোঁজার মধ্যে নয়। বরং সেটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কর্মঘণ্টার পরও কাজ, বাধ্যতামূলক সামাজিকতা এবং অবিরাম প্রতিযোগিতার যুগ থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যদি নিজের জন্য সময় চায়, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন আরোগ্যের ধারণাটি আরেক ধরনের ভোক্তা সংস্কৃতিতে রূপ নেয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মানুষ ক্লান্তির কারণ দূর করার বদলে ক্লান্তিকে সহনীয় করে তোলার উপায় কিনছে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা মানসিক উদ্বেগের মতো সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে তারা এমন পণ্য বা অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকছে, যা সাময়িক স্বস্তি দেয়। কিছুক্ষণের জন্য মনে হয় জীবন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু সেই অনুভূতি স্থায়ী হয় না।

এই প্রবণতা কেবল কোরিয়ার নয়, বিশ্বের বহু সমাজেই দেখা যায়। তবু কোরিয়ার ক্ষেত্রে এর গতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোনো সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি খুব দ্রুত একটি প্রবণতায় পরিণত হয়, আর তারপর সেই প্রবণতাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল বাজার। ফলাফল হিসেবে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়: মানুষ কম ক্লান্ত হওয়ার জন্য এত চেষ্টা করে যে সেই চেষ্টাই আবার নতুন ক্লান্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান দেখায়, খাদ্য-সম্পূরক গ্রহণের ক্ষেত্রে কোরিয়া শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এখন সেই বাজার শুধু ভিটামিন বা স্বাস্থ্যপণ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরোগ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আরও বিস্তৃত এক অর্থনীতি, যেখানে প্রায় প্রতিটি নতুন প্রবণতাকে জীবন বদলে দেওয়ার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে লেবুর রস ও অলিভ অয়েলের মিশ্রণ নিয়ে যে উন্মাদনা দেখা গেছে, সেটি এর একটি উদাহরণ। অলিভ অয়েলের কিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমর্থন রয়েছে। কিন্তু কোনো একটি উপাদানকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখানো বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অলিভ অয়েল ও সাইট্রাসজাতীয় খাদ্য ব্যবহার করে আসছে। সেখানে সুস্থতা কোনো বিশেষ আচার নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ধীরগতির খাবার, সামাজিক যোগাযোগ এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কোরিয়ার মতো সমাজে সুস্থতাকে প্রায়ই জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের বাইরে একটি অতিরিক্ত কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। ব্যস্ত সময়সূচির ভেতরে একটি নতুন অভ্যাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যেন সেটিই সমস্যার সমাধান। কিন্তু ঘুমের অভাব, দীর্ঘস্থায়ী চাপ বা মানসিক ক্লান্তির মতো বিষয়গুলো কোনো একক খাদ্য বা পানীয় দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রায়ই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন নতুন রুটিনকে সর্বজনীন সমাধান হিসেবে প্রচার করেন। ফলে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সঠিক পণ্যটি খুঁজে পেলেই জীবন সহজ হয়ে যাবে। এই বিশ্বাসের পেছনে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে।

যখন সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলো এত বড় হয়ে ওঠে যে ব্যক্তির পক্ষে সেগুলো পরিবর্তন করা অসম্ভব মনে হয়, তখন মানুষ ছোট ছোট ব্যক্তিগত পদক্ষেপে আশ্রয় খোঁজে। কেউ সহজে চাকরি ছাড়তে পারে না, কর্মসংস্কৃতি বদলাতে পারে না কিংবা সামাজিক চাপ থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু একটি নতুন পানীয় কিনতে পারে, একটি নতুন স্বাস্থ্যপণ্য ব্যবহার করতে পারে বা একটি নতুন রুটিন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র পদক্ষেপগুলো তাকে অন্তত সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়।

কিন্তু এখানেই আরেকটি বিপদ লুকিয়ে আছে। যখন ব্যক্তিগত ভোগকে সামাজিক সমস্যার সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন বৃহত্তর পরিবর্তনের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে আরোগ্যও প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে যায়। কে বেশি সচেতন, কে বেশি স্বাস্থ্যবান, কে আরও কার্যকরভাবে নিজেকে সুস্থ করে তুলছে—এই তুলনা নতুন চাপ তৈরি করে।

প্রকৃত আরোগ্য সাধারণত এত আকর্ষণীয় নয়। সেটি ধীর, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং অনেক সময় একঘেয়ে। পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক, সুষম জীবনযাপন এবং কাজের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য—এসবের কোনো চটকদার বিপণন ভাষা নেই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলিই সবচেয়ে কার্যকর।

এতে অবশ্য সুস্থতাকেন্দ্রিক পণ্য, রিট্রিট বা অভিজ্ঞতার গুরুত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করা হয় না। এগুলো মানুষের জীবনে বিরতি, প্রশান্তি এবং আত্মচিন্তার সুযোগ এনে দিতে পারে। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সেগুলোকে সহায়ক উপকরণের বদলে মূল সমাধান হিসেবে দেখা হয়।

আরোগ্য-শিল্পের বিস্তার আসলে মানুষের বাস্তব চাহিদার প্রতিফলন। কিন্তু যদি সেই চাহিদার জবাব কেবল নতুন পণ্য, নতুন প্রবণতা এবং নতুন ভোগের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে ফলাফল হবে সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী পরিবর্তন নয়।

শেষ পর্যন্ত সুস্থতা এমন কিছু নয় যা সম্পূর্ণভাবে কেনা যায়। এটি সময়ের, ভারসাম্যের এবং জীবনযাপনের সাহসী পুনর্বিবেচনার ফল। বাজার হয়তো আরামের অনুভূতি বিক্রি করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের আরোগ্য বিক্রি করার ক্ষমতা কোনো শিল্পের নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর: পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর আনন্দের ভারসাম্য কীভাবে রাখবেন

আরোগ্যের বাজার: সুস্থতা যখন পণ্যে পরিণত হয়

০৩:১১:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক জীবন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, দ্রুতগতির কর্মসংস্কৃতি এবং প্রতিযোগিতার চাপ; অন্যদিকে ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ এবং এক ধরনের গভীর সামাজিক শ্রান্তি। দীর্ঘদিন ধরে এই চাপকে উন্নতির মূল্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন মানুষ সেই মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। ফলে বিশ্রাম, মানসিক শান্তি এবং ব্যক্তিগত সুস্থতার অনুসন্ধান ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এই অনুসন্ধানের একটি অস্বস্তিকর দিকও রয়েছে: আরোগ্য কি সত্যিই জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, নাকি সেটিও আরেকটি ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়েছে?

আজকের কোরিয়ায় ‘হিলিং’ বা সুস্থতা শুধু একটি ধারণা নয়; এটি একটি বাজার। খাবারের বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পর্যটন শিল্প, জীবনধারা-বিষয়ক পণ্য—সবখানেই আরোগ্যের প্রতিশ্রুতি। এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে বিশ্রামও যেন পরিকল্পনা করে কিনে নিতে হয়। মানুষকে বলা হচ্ছে, সঠিক পানীয়, সঠিক সম্পূরক, সঠিক রিট্রিট কিংবা সঠিক অভিজ্ঞতা বেছে নিলেই জীবনের চাপ কমে যাবে। অথচ প্রশ্ন হলো, সমস্যার উৎস অপরিবর্তিত রেখে কি সত্যিই সমাধান সম্ভব?

এখানে মূল সংকট মানুষের বিশ্রাম খোঁজার মধ্যে নয়। বরং সেটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কর্মঘণ্টার পরও কাজ, বাধ্যতামূলক সামাজিকতা এবং অবিরাম প্রতিযোগিতার যুগ থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যদি নিজের জন্য সময় চায়, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন আরোগ্যের ধারণাটি আরেক ধরনের ভোক্তা সংস্কৃতিতে রূপ নেয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মানুষ ক্লান্তির কারণ দূর করার বদলে ক্লান্তিকে সহনীয় করে তোলার উপায় কিনছে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা মানসিক উদ্বেগের মতো সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে তারা এমন পণ্য বা অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকছে, যা সাময়িক স্বস্তি দেয়। কিছুক্ষণের জন্য মনে হয় জীবন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু সেই অনুভূতি স্থায়ী হয় না।

এই প্রবণতা কেবল কোরিয়ার নয়, বিশ্বের বহু সমাজেই দেখা যায়। তবু কোরিয়ার ক্ষেত্রে এর গতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোনো সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি খুব দ্রুত একটি প্রবণতায় পরিণত হয়, আর তারপর সেই প্রবণতাকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিশাল বাজার। ফলাফল হিসেবে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়: মানুষ কম ক্লান্ত হওয়ার জন্য এত চেষ্টা করে যে সেই চেষ্টাই আবার নতুন ক্লান্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান দেখায়, খাদ্য-সম্পূরক গ্রহণের ক্ষেত্রে কোরিয়া শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এখন সেই বাজার শুধু ভিটামিন বা স্বাস্থ্যপণ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরোগ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আরও বিস্তৃত এক অর্থনীতি, যেখানে প্রায় প্রতিটি নতুন প্রবণতাকে জীবন বদলে দেওয়ার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে লেবুর রস ও অলিভ অয়েলের মিশ্রণ নিয়ে যে উন্মাদনা দেখা গেছে, সেটি এর একটি উদাহরণ। অলিভ অয়েলের কিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমর্থন রয়েছে। কিন্তু কোনো একটি উপাদানকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখানো বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অলিভ অয়েল ও সাইট্রাসজাতীয় খাদ্য ব্যবহার করে আসছে। সেখানে সুস্থতা কোনো বিশেষ আচার নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ধীরগতির খাবার, সামাজিক যোগাযোগ এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে কোরিয়ার মতো সমাজে সুস্থতাকে প্রায়ই জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের বাইরে একটি অতিরিক্ত কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। ব্যস্ত সময়সূচির ভেতরে একটি নতুন অভ্যাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যেন সেটিই সমস্যার সমাধান। কিন্তু ঘুমের অভাব, দীর্ঘস্থায়ী চাপ বা মানসিক ক্লান্তির মতো বিষয়গুলো কোনো একক খাদ্য বা পানীয় দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রায়ই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন নতুন রুটিনকে সর্বজনীন সমাধান হিসেবে প্রচার করেন। ফলে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সঠিক পণ্যটি খুঁজে পেলেই জীবন সহজ হয়ে যাবে। এই বিশ্বাসের পেছনে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে।

যখন সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলো এত বড় হয়ে ওঠে যে ব্যক্তির পক্ষে সেগুলো পরিবর্তন করা অসম্ভব মনে হয়, তখন মানুষ ছোট ছোট ব্যক্তিগত পদক্ষেপে আশ্রয় খোঁজে। কেউ সহজে চাকরি ছাড়তে পারে না, কর্মসংস্কৃতি বদলাতে পারে না কিংবা সামাজিক চাপ থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু একটি নতুন পানীয় কিনতে পারে, একটি নতুন স্বাস্থ্যপণ্য ব্যবহার করতে পারে বা একটি নতুন রুটিন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র পদক্ষেপগুলো তাকে অন্তত সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়।

কিন্তু এখানেই আরেকটি বিপদ লুকিয়ে আছে। যখন ব্যক্তিগত ভোগকে সামাজিক সমস্যার সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন বৃহত্তর পরিবর্তনের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে আরোগ্যও প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে যায়। কে বেশি সচেতন, কে বেশি স্বাস্থ্যবান, কে আরও কার্যকরভাবে নিজেকে সুস্থ করে তুলছে—এই তুলনা নতুন চাপ তৈরি করে।

প্রকৃত আরোগ্য সাধারণত এত আকর্ষণীয় নয়। সেটি ধীর, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং অনেক সময় একঘেয়ে। পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক, সুষম জীবনযাপন এবং কাজের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য—এসবের কোনো চটকদার বিপণন ভাষা নেই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলিই সবচেয়ে কার্যকর।

এতে অবশ্য সুস্থতাকেন্দ্রিক পণ্য, রিট্রিট বা অভিজ্ঞতার গুরুত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করা হয় না। এগুলো মানুষের জীবনে বিরতি, প্রশান্তি এবং আত্মচিন্তার সুযোগ এনে দিতে পারে। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সেগুলোকে সহায়ক উপকরণের বদলে মূল সমাধান হিসেবে দেখা হয়।

আরোগ্য-শিল্পের বিস্তার আসলে মানুষের বাস্তব চাহিদার প্রতিফলন। কিন্তু যদি সেই চাহিদার জবাব কেবল নতুন পণ্য, নতুন প্রবণতা এবং নতুন ভোগের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে ফলাফল হবে সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী পরিবর্তন নয়।

শেষ পর্যন্ত সুস্থতা এমন কিছু নয় যা সম্পূর্ণভাবে কেনা যায়। এটি সময়ের, ভারসাম্যের এবং জীবনযাপনের সাহসী পুনর্বিবেচনার ফল। বাজার হয়তো আরামের অনুভূতি বিক্রি করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের আরোগ্য বিক্রি করার ক্ষমতা কোনো শিল্পের নেই।