ঢাকার একটি অতিপ্রয়োজনীয় হাসপাতাল বন্ধ হলো। হাসপাতাল আদদ্বীনের অপরাধ, ভুল বা অবহেলার কারণে সেখানে ছয় শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। সরকারি প্রেস নোটে যা জানা যাচ্ছে, এই মৃত্যুর কারণ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তা সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলে তারা হাসপাতালটি বন্ধ করে দিয়েছে। বলা যেতে পারে এই সরকারের গত চারমাসে এটাই সব থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত। এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত।
আদদ্বীন হাসপাতালটি বর্তমান সময়ের শহরের উচ্চবিত্ত এলাকায় যেমন নয় তেমনি হাসপাতালটি মোটেই উচ্চবিত্তদের জন্য নয়। প্রথমত নারী ও শিশুদের জন্য নিম্নবিত্ত ও দরিদ্রদের জন্য একটি হাসপাতাল। বিশেষ করে প্রসূতি সেবাই সেখানে মূল লক্ষ্য। যতদূর মনে পড়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই ছোট্ট গলির ভেতর গিয়ে হাসপাতালটি উদ্বোধন করেছিলেন। সে সময়ে তাঁর দলের মধ্যে এ নিয়ে অনেকের দ্বিমত ছিলো যে হাসপাতালের মালিকানা ভিন্ন রাজনীতির লোকের তারপরেও তিনি কেন এটা করতে গেলেন।

যাহোক, এই হাসপাতালটি প্রথমেই ঢাকা শহরে একটা নতুন সংযোজন করে মাত্র ৫০ টাকায় ঢাকার যে কোন জায়গায় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করে। এখন সেটা কত হয়েছে তা ঠিক জানা নেই। তবে ২৫০ টাকা এক পর্যায়ে ছিলো এটা জানতাম। টাকার মূল্যমান যে হারে কমেছে ধারাবাহিকভাবে তাতে ওই সময়ে ২৫০ টাকা নাম মাত্র বলা যেতে পারে।
পেশাগত কারণে নানান জায়গায় যেতে হয় বিভিন্ন সময়ে। খুব ভোরে বা রাত্রেও দেখেছি গ্রাম থেকে লুঙ্গি পরা মানুষ পর্দানশীন স্ত্রী, কন্যা বা মাতাকে নিয়ে সেখানে আসছেন। আবার আধুনিক পোষাক পরা নারীদেরও সেখানে অবাধ যাতায়ত।
পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে যদি বলতে হয় তাহলে বলবো, ঢাকার যে তিনটি আভিজাত প্রাইভেট হাসপাতাল, যেখানে ঢুকলেই বিল লাখ থেকে শুরু হয় তার থেকে কোন অংশে কম নয়, বরং বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হবে। নারী ও শিশুদের হাসপাতাল তাই দিন ও রাতের কর্মী হিসেবে সেখানে বেশি সংখ্যক নারীরাই কাজ করেন।
বাংলাদেশের সব থেকে বড় ঘাটতি যেটা ডাক্তারের থেকে টেকনিশিয়ান ও নার্স। দেশের মান অনুযায়ী এ হাসপাতালে এই টেকনিশিয়ান ও নার্স যে খুব খারাপ তেমন রিপোর্টও পায়নি।
তাদের কাজ সম্পর্কে দুটো ঘটনা জানা আছে। ব্লাড টেস্টের বিষয়ে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সব সময়ই গুরুত্ব দিতেন আইসিডিডিআরবিকে। যে কারণে আমার পরিচিত একজন আদদ্বীন থেকে রক্ত পরীক্ষা করালে তাকে কিছুটা বকাঝকা করে আইসিডিডিআরবিতে পুনরায় পাঠিয়েছিলাম। রেজাল্ট খাবার দাবারের কারণে দুই একটা যে সামান্য একটু এদিক ওদিক হয় এছাড়া একই ছিলো।
আরেকটি ঘটনা, একটি আভিজাত প্রাইভেট হাসপাতালে দুই দিন ক্যানোলা রাখার কারণে এক ব্যক্তির হাতের মুঠির শিরায় এখনও ক্লটের মতো আছে, তবে সেটা বোঝা যায় না। তিনি আদদ্বীনে গেলে তার হাতের ওই অবস্থা দেখেই টেকনিশিয়ান মেয়েটি বলেন, আপনার হাতের তো এই অবস্থা ওখান থেকে রক্ত নেয়া যাবে না। তবে আমি অন্যভাবে নিচ্ছি।
যাহোক, আমি এই হাসপাতালের গুণগান গাইতে বসিনি। হাসপাতাল সম্পর্কে যতটুকু জানা আছে সেটাই উল্লেখ করলাম। আর উল্লেখ করার একমাত্র কারণ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কয়েক চিকিত্সকের অবহেলায় সেখানে ছয় শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। তাই সমস্যাটি যে গোটা শরীরের তা নয়, একটি অঙ্গেরও কিছু জায়গা জুড়ে – এটাই বলা যায়।
অবশ্য, সরকারের সিদ্ধান্তের পরে মনে হয়েছে- সরকার বড়ই কৃতিত্বকর্মা। শরীরের ওই বিশেষ ক্ষতস্থানটি না খুঁজে, সেখানে শাস্তি দিয়ে শরীরটিকে বাঁচিয়ে রাখার মতো ঝামেলায় তারা না গিয়ে- গোটা শরীরটিই নষ্ট করে দিয়েছে। সাধারণ বাঙালির কাছে এ ধরনের সিদ্ধান্তই আশা করা উচিত। তা না হলে বাংলায় প্রবাদ থাকবে কেন, মাথা ব্যথা হয়েছে বলে মাথা কেটে ফেলে দিয়ো না।

কিন্তু এরপরেই যে প্রশ্নটি আসে, ছয় নব জাতকের মৃত্যুতে যে সরকার এত কঠিন, সরকারি হিসেবে সেই সরকারের আমলে এই লেখা যখন লিখছি এ সময় অবধি ৬শত ৪৩ শিশু মারা গেছে হামে। লোকজনে বলে বাস্তবে এটা নাকি ৪ হাজারের বেশি হবে। যাহোক, সব সরকারের নিন্দুক থাকে, একটু বেশিমাত্রার সমালোচকও থাকে, তারা এই বেসরকারিটা প্রমাণ করার চেষ্টাও করবে। যেহেতু আমাদের দেশে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোটিং এর ওই ধরনের স্বাধীন ও বড় মাপের প্রতিষ্ঠান নেই- তাই সাংবাদিক হিসেবে সরকারি হিসেবের বাইরে যাবার কোন উপায় নেই। এবং সরকারি হিসেবে ইতোমধ্যে ৮৪ হাজারের ওপর শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। এই হামের আক্রান্তদের প্রায় ৭’শ এর মতো যেহেতু মারা গেছে- বাদবাকীরা বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়েছে। নারী শিশু হাসপাতাল আদদ্বীন থেকেও অনেক শিশু সুস্থ হয়েছে সেটা ধরে নেয়া যায়।
আদদ্বীনের প্রসঙ্গের থেকে বড় হচ্ছে, এই যে ৬৪৩ শিশু মারা গেলো হামে। এর মূল কারণ এখন বাংলাদেশে সবাই জানেন। মূল কারণ, ড. ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন সরকারের আমলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বার বার হুশিয়ারি করা সত্ত্বেও এবং শেখ হাসিনার সরকারের আমলের বাজেটে অর্থ থাকা সত্ত্বেও হামের টিকা কেনা হয়নি ও দেয়া হয়নি। যার ফলে আজ সরকারি হিসেবে ৬৪৩ শিশু মারা গেছে। আদদ্বীনেও যেমন অবহেলায় ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এখানে উদ্দেশ্য প্রনোদিত অবহেলায় না ধরলেও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাজনিত অবহেলায় আজ অবধি ৬৪৩ শিশু মারা গেছে। এবং মৃত্যুর মিছিল চলমান। কোনদিন ডাবল ফিগার ও কোনদিন সিঙ্গেল ফিগার। অথচ যিনি এই মৃত্যুর মিছিলের অভিযোগে অভিযুক্ত জনগণের কাছে– সেই ইউনূস ভিআইপি প্রোটেকশান পাচ্ছে জনগণের টাকায়। তার বিরুদ্ধে সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি শিশু মৃত্যুর একজন মূর্তিমান কারণ হবার পরেও। আর তার সময়ের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও সরকার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
অন্যদিকে হামে যেহারে মারা যাচ্ছে এটা অস্বাভাবিক। হাম হলেই এত মৃতের হার হবার কথা নয়। তাছাড়া বিষয়টি অনেকটা মহামারী পর্যায়ে চলে গেছে। অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চার মাসে মৃতের হার কমাতে পারেনি।

চারমাসে যে স্বাস্থ্য মন্ত্রী হামের মৃতের হার কমাতে পারেননি এর পরে তাঁর নৈতিকভাবে ওই দায়িত্বে থাকার কতটুকু অধিকার থাকে? বাংলাদেশ বা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে সরে দাঁড়ানোর কালচার নেই। আর সরে দাঁড়ালে মুশকিলও আছে, ভারতে রেল দুর্ঘটনাকে নিজের ব্যর্থতা মনে করে জওয়াহের লাল নেহেরু’র আমলে যে মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন, তিনি পরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও শেষ জীবনে বাড়ি ভাড়া দিতে না পারার কারণে তাকে বাসা থেকে বের করে দেয় বাড়িওয়ালা। আর সেক্ষেত্রে রাজনীতিতে আসার অন্যতম কারণ যে সব দেশে কমিশন ও চাঁদাবাজী- সেখানে এ আশা না করাই ভালো।
তবে আদদ্বীন হাসপাতাল নিয়ে এই মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেবার দ্রুত কাজটির সঙ্গে নিশ্চয়ই স্বাস্থ্য মন্ত্রীও ছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই এই সিদ্ধান্ত নেবার সময় নাটক বা সিনেমা দেখতে যাননি। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন আসে হামে শিশু মৃত্যুর দায় কি কারও নেই?
জাতি হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠান গড়ি না। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবে সে ধরনের প্রতিষ্ঠান কমই গড়া হয় বেসরকারিভাবে। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান না করে বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত বহাল থাকা কি ঠিক?
তবে বর্তমান সময়ে হাসপাতাল আদদ্বীন নিয়ে চিন্তা না করে ভারতের মেডিকেল ভিসা আরো সহজ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে বলার উদ্যোগ নেয়াই মনে হয় যথার্থ কাজ হবে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 



















