কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে সাধারণত মানবসভ্যতার পরবর্তী বড় প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর আলোচনায় থাকে উন্নত সফটওয়্যার, দ্রুততর উৎপাদনশীলতা, নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার গল্প। কিন্তু এই উজ্জ্বল বর্ণনার আড়ালে একটি কম আলোচিত বাস্তবতা রয়েছে—এআই অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল জ্বালানি উৎপাদনের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে কিছু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর।
পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি শিল্পাঞ্চল আজ সেই বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠছে। সেখানে এআই-নির্ভর অর্থনীতির সম্প্রসারণের ফলে শুধু বিদ্যুতের চাহিদাই বাড়ছে না; একই সঙ্গে বাড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, বায়ুদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুবিধা যেখানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তার পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত খরচ কিন্তু সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না।
বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোর একটি হলো তাইওয়ান। বৈশ্বিক এআই শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় চিপের বিশাল অংশ সেখানেই তৈরি হয়। এই শিল্পের বিস্তার দেশটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে বিশাল বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা। বৃহৎ চিপ উৎপাদন কারখানা এবং ডেটা সেন্টারগুলো পরিচালনা করতে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, তা পূরণ করতে সরকারকে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দিকে যেতে হচ্ছে।
সমস্যা হলো, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে এখনও প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লাকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। ফলে যে অঞ্চলগুলো আগে থেকেই শিল্পদূষণে আক্রান্ত, সেগুলো নতুন করে আরও চাপের মুখে পড়ছে। বহু বছর ধরে বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা স্থানীয় বাসিন্দারা দেখছেন, প্রযুক্তির নতুন যুগ তাদের জন্য পুরোনো সমস্যাকেই আরও গভীর করে তুলছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এআইকে প্রায়ই “পরিষ্কার” প্রযুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কারণ এটি সফটওয়্যারভিত্তিক এবং দৃশ্যমান ধোঁয়া বা কারখানার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি এআই মডেলের পেছনে রয়েছে শক্তিখেকো সার্ভার, ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর কারখানা এবং তাদের চালাতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। অর্থাৎ ডিজিটাল জগতের এই অগ্রগতিরও একটি বাস্তব ও ভৌত অবকাঠামো রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই চাহিদা পূরণে নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশগত প্রভাব পুরোপুরি মূল্যায়নের আগেই অনেক প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছে, যা নীতিনির্ধারণে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রাধান্যকে স্পষ্ট করে।
এ ধরনের সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কেবল প্রকল্প এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুদূষণ সীমানা মানে না। ক্ষতিকর কণা ও দূষক উপাদান বাতাসের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শিল্পপ্রকল্পের সুবিধাভোগী এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী প্রায়শই এক নয়। যারা লাভ পায় তারা অনেক সময় দূরে থাকে, আর যারা দূষণের শিকার হয় তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে কম প্রতিনিধিত্ব পায়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই ও ডেটা সেন্টারের প্রসারের কারণে আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশও বাড়বে, কিন্তু বাস্তবতা হলো অধিকাংশ সরকার ও প্রতিষ্ঠান এখনও দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে। কারণ এটি তুলনামূলকভাবে সহজ, পরিচিত এবং তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য।
কিন্তু এই স্বল্পমেয়াদি সুবিধার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তো রয়েছেই, পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষতির মতো অর্থনৈতিক মূল্যও দিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংকট ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আরও দেখিয়ে দিয়েছে যে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের হিসাব করলেই চলবে না; এর সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের পদ্ধতি আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি, আঞ্চলিক দূষণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পূর্ণ চিত্র সামনে আসে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও তাদের জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলের বাস্তব কার্যক্রমের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।
এআই বিপ্লব নিঃসন্দেহে বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্য কে দিচ্ছে? যদি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আর্থিক সুফল একদল ভোগ করে এবং স্বাস্থ্যগত ক্ষতি অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি টেকসই উন্নয়ন নয়। বরং তা এমন এক অসম ব্যবস্থা, যেখানে উন্নয়নের প্রকৃত খরচ আড়ালে থেকে যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তেজনা যতই থাকুক, এর পেছনের শক্তি, সম্পদ এবং মানবিক মূল্য সম্পর্কে সৎ আলোচনা এখন সময়ের দাবি। কারণ অদৃশ্য খরচকে উপেক্ষা করলে তা শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান সংকটে পরিণত হয়—এবং তখন তার মূল্য সবাইকেই দিতে হয়।
ইউজি শুয়ে 


















