মা দিবস এলে যেন উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। আগে থেকেই পরিকল্পনা, উপহার, পারিবারিক আয়োজন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তার ছড়াছড়ি দেখা যায়। কিন্তু বাবা দিবস এলে সেই উচ্ছ্বাস অনেকটাই কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে একটি শুভেচ্ছা কার্ড, একটি সাধারণ উপহার বা পরিবারের সঙ্গে একটি খাবারের আয়োজনেই শেষ হয়ে যায় দিনটি। প্রশ্ন হলো, এই পার্থক্য কি কেবল কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে সমাজের দীর্ঘদিনের একটি মানসিকতা?
অনেকের শৈশবের স্মৃতিতে বাবার উপস্থিতি নীরব কিন্তু গভীর। স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা, সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা কিংবা পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম—এসবই বাবার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। অথচ এই অবদান অনেক সময় প্রকাশ্যে তেমন স্বীকৃতি পায় না।
বাবাদের ‘সহকারী অভিভাবক’ হিসেবে দেখার প্রবণতা
সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে মাকেই প্রধান অভিভাবক হিসেবে দেখা হয়। সন্তান লালন-পালনের দায়িত্বের কথা উঠলে মায়ের ভূমিকাই বেশি আলোচিত হয়, আর বাবাকে ধরা হয় সহায়ক হিসেবে। ফলে সন্তানদের জীবনে বাবার অবদানকে অনেক সময় স্বাভাবিক দায়িত্বের বাইরে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
এই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় নানা ক্ষেত্রে। বিদ্যালয়ের জরুরি যোগাযোগের তালিকা থেকে শুরু করে শিশুর স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিষয়েও অনেক সময় মাকেই কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে ধরা হয়। ফলে বাবারা ধীরে ধীরে প্রান্তিক ভূমিকায় চলে যান, যদিও বাস্তবে অনেক পরিবারে তারা সমানভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবর্তন হচ্ছে বাস্তবতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবার ও সন্তান পালনের ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। অনেক বাবা এখন সন্তানদের দৈনন্দিন যত্ন, শিক্ষা, খেলাধুলা ও মানসিক বিকাশে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। কেউ কেউ ঘরে থেকে সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্বও গ্রহণ করছেন। কর্মক্ষেত্রেও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং যৌথ অভিভাবকত্বের ধারণা ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবু বাস্তবতায় এখনও এমন ধারণা প্রচলিত যে, সন্তান পালনে বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। অথচ এটি ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত দায়িত্ব হওয়া উচিত।
স্বীকৃতি মানে অতিরিক্ত প্রশংসা নয়
বাবাদের সম্মান জানানো মানে তাদের সাধারণ দায়িত্ব পালনের জন্য অযথা প্রশংসা করা নয়। বরং এটি এমন একটি বার্তা দেওয়া যে, পরিবারের প্রতি তাদের ধারাবাহিক দায়িত্ববোধ ও উপস্থিতি মূল্যবান। সন্তানদের জীবনে একজন যত্নশীল ও দায়িত্বশীল বাবার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর।

বাবা দিবসকে গুরুত্ব দেওয়া তাই কেবল একটি দিন উদযাপন নয়। এটি পরিবারে যৌথ দায়িত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সমান অংশীদারত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ।
নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা হতে পারে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যে সন্তান লালন-পালন কেবল মায়ের দায়িত্ব নয়, এটি মা-বাবা উভয়ের যৌথ দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় এই ধারণা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বাবা দিবসকে গুরুত্ব দিয়ে উদযাপন করা সেই পরিবর্তনের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। কারণ একজন বাবার নীরব অবদানও স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। পরিবারে তাঁর উপস্থিতি, সময় এবং ভালোবাসা সন্তানদের জীবনে অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকে।
বাবাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। আন্তরিক কয়েকটি শব্দ, একটি স্মৃতি বা পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোই হতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। কারণ দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বকে স্বাভাবিক ও সম্মানজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















