বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ‘রেঞ্জ অ্যানজাইটি’ বা চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়। তবে মালয়েশিয়ার জাতীয় গাড়ি নির্মাতা প্রোটন দেখিয়েছে, এই উদ্বেগের মূল কারণ ব্যাটারির সীমিত সক্ষমতা নয়, বরং তথ্যের ঘাটতি। আর সেই সমস্যার সমাধান করেই প্রতিষ্ঠানটি তাদের নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে সফলতা পেয়েছে।
সম্প্রতি বাজারে আসা প্রোটনের ই.মাস ৫ মডেলটি উদ্বোধনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই দেশের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বৈদ্যুতিক গাড়িতে পরিণত হয়েছে। এই সময়ে প্রায় ১০ হাজার ক্রেতা গাড়িটি কিনেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই প্রথমবারের মতো গাড়ির মালিক হয়েছেন।
উচ্চ ভবনের বাসিন্দারাও এগিয়ে
বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা ছিল যে, শুধুমাত্র নিজস্ব বাড়ি ও ব্যক্তিগত চার্জিং সুবিধা থাকা মানুষই এসব গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু প্রোটনের বিক্রির তথ্য সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

ই.মাস ৫-এর প্রায় ২০ শতাংশ ক্রেতা অ্যাপার্টমেন্ট ও কনডোমিনিয়ামে বসবাস করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হার প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ক্রেতাদের সঙ্গেও প্রায় একই। অর্থাৎ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে আবাসনের ধরন আর বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।
তথ্যই বদলে দিয়েছে চিত্র
প্রোটনের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে একটি সহজ কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ। গাড়ি বাজারে ছাড়ার আগেই প্রতিষ্ঠানটি সব গাড়িতে সরাসরি একটি চার্জিং মানচিত্র যুক্ত করে দেয়।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চালকরা তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেন কোথায় দ্রুত চার্জিং কেন্দ্র রয়েছে, কোথায় গন্তব্যভিত্তিক চার্জিং সুবিধা আছে এবং কোন চার্জার ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। ফলে চালকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ অনেকটাই কমে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে মানুষ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার নিয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
চার্জিংয়ের নতুন বাস্তবতা
অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা সপ্তাহান্তে কেনাকাটার সময় গাড়ি চার্জ করেন। আবার অনেকে কর্মস্থলের চার্জিং সুবিধা ব্যবহার করেন। ফলে দৈনন্দিন চলাচলে তারা বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন না।

তবে ছুটির মৌসুমে বা দূরপাল্লার ভ্রমণের সময় চার্জিং স্টেশনে ভিড় তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা নয়; বরং চার্জিং অবকাঠামোর বণ্টনসংক্রান্ত সমস্যা।
অবকাঠামো সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জ
চার্জিং স্টেশন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, নতুন চার্জার স্থাপনের সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তিগত নয়, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। বিভিন্ন অনুমোদন, নিরাপত্তা যাচাই এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ সমন্বয়ের কারণে একটি চার্জিং স্টেশন চালু করতে অনেক সময় লেগে যায়।
এ ছাড়া বড় ক্ষমতার চার্জিং ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য প্রকৌশলী ও স্থপতিদের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, যা ব্যয় ও সময়—দুই-ই বাড়িয়ে দেয়।
নীতিগত সহায়তার দাবি
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার আরও বাড়াতে চার্জিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ বিদ্যুৎ শুল্ক চালু করা প্রয়োজন। রাতের বেলায় কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে চার্জিং খরচ কমবে এবং নতুন বিনিয়োগও বাড়বে।

পাশাপাশি চার্জার স্থাপনে আর্থিক সহায়তা, কর-সুবিধা এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করারও দাবি উঠেছে। কারণ জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় স্থানে সেই বিদ্যুৎ পৌঁছানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের প্রধান প্রশ্ন কখনোই কেবল ব্যাটারির পরিসর ছিল না। মূল বিষয় হলো ব্যবহারকারীর বিশ্বাস। চালকরা জানতে চান, প্রয়োজনের সময় চার্জার পাওয়া যাবে কি না, মানচিত্রে দেখানো তথ্য সঠিক কি না এবং দীর্ঘ যাত্রায় তারা বিপদে পড়বেন কি না।
প্রোটন সেই বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছে। ফলে অল্প সময়েই বিপুলসংখ্যক নতুন ক্রেতা বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকেছেন। এটি প্রমাণ করে যে বাজার প্রস্তুত রয়েছে, এখন প্রয়োজন আরও শক্তিশালী অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তা।
মালয়েশিয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তার দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির পাশাপাশি তথ্য, আস্থা ও সহজলভ্য সেবাই ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















