ভারতের দ্রুত পণ্য সরবরাহের বাজারে একসময় বিপ্লবের প্রতীক হয়ে উঠেছিল জেপ্টো। কয়েক মিনিটের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস পর্যন্ত গ্রাহকের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার এই ব্যবসা খুব অল্প সময়েই শহুরে মানুষের কেনাকাটার অভ্যাস বদলে দিয়েছে। কিন্তু দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেও এবার বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রায় ৮৪ কোটি ডলারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেপ্টো। প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না পাওয়ায় আপাতত শেয়ারবাজারে যাওয়ার বদলে ব্যক্তিমালিকানাধীন পর্যায়ে শেয়ার বিক্রির পথ বেছে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বড় হচ্ছে লোকসান
জেপ্টোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন এর বিপুল লোকসান। চলতি বছরের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা জেপ্টোর আগের ব্যক্তিগত বাজারমূল্যায়ন প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের অর্ধেকেরও বেশি মূল্য দিতে আগ্রহী হননি।
অর্থাৎ দ্রুত ব্যবসা বাড়ানো এবং বিপুল সংখ্যক গ্রাহক তৈরি করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো এমন একটি ব্যবসায়িক মডেল দেখাতে পারেনি, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত মুনাফার নিশ্চয়তা দিতে পারে।
জেপ্টো অবশ্য বলেছে, আইপিওর আগে প্রতিষ্ঠানটি এখন ব্যবসা পরিচালনা ও বাস্তবায়নের দিকে পুরোপুরি মনোযোগ দেবে। আপাতত ব্যক্তিগত পর্যায়ে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পাঁচ বছরে তৈরি হয়েছে বিশাল বাজার
ভারতে দ্রুত পণ্য সরবরাহের ব্যবসা শুরু হয়েছে মাত্র কয়েক বছর আগে। কিন্তু এরই মধ্যে বাজারটি প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের আকার নিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এই বাজার প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শহরাঞ্চলের গ্রাহকদের মধ্যে দ্রুত পণ্য পাওয়ার অভ্যাস তৈরি হওয়ায় এই খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বড় ধরনের আশাবাদ রয়েছে। আগে যেখানে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত পণ্য আনার জন্য এই সেবা ব্যবহার করা হতো, এখন নিয়মিত গৃহস্থালি কেনাকাটা এবং অন্যান্য পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
তবে গ্রাহকের কাছে জনপ্রিয় হওয়া আর বিনিয়োগকারীদের জন্য লাভজনক হওয়া এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যই এখন ভারতের দ্রুত বাণিজ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
প্রতিযোগিতায় চাপ বাড়ছে
জেপ্টোর সামনে শুধু লোকসানই নয়, প্রতিযোগিতাও বড় সমস্যা। বাজারে আগে থেকেই ব্লিঙ্কিট, রিলায়েন্স রিটেইল ও টাটা গোষ্ঠীর বিগবাস্কেটের মতো বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওয়ালমার্ট মালিকানাধীন ফ্লিপকার্ট এবং অ্যামাজন।
ফলে গ্রাহক ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একদিকে হাজার হাজার ছোট গুদাম বা স্থানীয় সরবরাহকেন্দ্র তৈরি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ছাড় ও নানা ধরনের প্রণোদনা দিতে হচ্ছে। এতে দ্রুত বাজার দখল করা সম্ভব হলেও ব্যয়ের পরিমাণও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি খরচ কমিয়ে লোকসান নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে প্রতিযোগীরা সেই সুযোগে বাজার দখল করতে পারে। আবার বাজার ধরে রাখতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করলে লোকসান আরও বাড়তে পারে। এই দুইয়ের মাঝেই আটকে গেছে দ্রুত বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো।

একই চাপে সুইগিও
জেপ্টো একা নয়। দ্রুত পণ্য সরবরাহের সেবা ইনস্টামার্ট পরিচালনাকারী সুইগিও একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে।
সম্প্রতি একটি শেয়ারবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সুইগির বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ইনস্টামার্টের প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ানোর নতুন পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এপ্রিল থেকে জুন সময়ে সুইগির লোকসান আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৭৯১ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। এদিকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ নিচে রয়েছে।
ইনস্টামার্টের প্রধান নির্বাহী ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তাও জুনের পর প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন। ফলে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং মুনাফার পথ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
বিনিয়োগের অর্থ কমে যাচ্ছে
দ্রুত বাণিজ্য খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অর্থের জোগান কমে যাওয়া। কয়েক বছর আগেও ভারতের নতুন প্রযুক্তি ও ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ পাচ্ছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
ভারতের বিভিন্ন নতুন উদ্যোগ গত বছর মোট প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার অর্থ সংগ্রহ করেছে। ২০২১ সালের উন্মাদনার সময় এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।
অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু দ্রুত প্রবৃদ্ধির গল্প শুনে অর্থ ঢালতে চাইছেন না। তারা জানতে চাইছেন—কবে প্রতিষ্ঠানটি লাভ করবে, কীভাবে লোকসান কমাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কী ধরনের আয় তৈরি করবে।
জেপ্টোর আইপিও কেন গুরুত্বপূর্ণ
জেপ্টো ভারতের দ্রুত বাণিজ্য খাতের অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এর পেছনে অর্থ দিয়েছে। ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ভারতের দ্রুত বাণিজ্য খাতে সংগৃহীত প্রায় ৫১০ কোটি ডলারের মধ্যে জেপ্টো একাই প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থ পেয়েছে বলে হিসাব রয়েছে।
এ কারণে জেপ্টোর আইপিও শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে প্রবেশের ঘটনা ছিল না। এটি পুরো দ্রুত বাণিজ্য খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার একটি পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছিল।
সেই পরীক্ষায় আপাতত আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় খাতটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রবৃদ্ধি নাকি মুনাফা—কোন পথে যাবে খাতটি?
ভারতের দ্রুত বাণিজ্য খাতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—প্রতিষ্ঠানগুলো কি আরও দ্রুত বাজার বাড়ানোর জন্য অর্থ ব্যয় করবে, নাকি লোকসান কমানোর জন্য প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমাবে?
বাজার দখলের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়লে গ্রাহক ও বাজার দুটোই প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে চলে যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত ব্যয় করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
অনলাইন কেনাকাটা ও খাবার সরবরাহের ব্যবসার শুরুর দিকেও একই ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা গিয়েছিল। তখন অনেক প্রতিষ্ঠান বাজার দখলের জন্য বিপুল অর্থ খরচ করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বহু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি।
দ্রুত বাণিজ্যেও সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জেপ্টোর আইপিও স্থগিত হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি কোম্পানির অর্থসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি ভারতের দ্রুত বাণিজ্য খাতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত—গ্রাহকের অভ্যাস বদলানো সম্ভব হলেও, সেই পরিবর্তনকে টেকসই মুনাফায় রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
জেপ্টো ও এর প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামনে তাই আগামী দিনের লড়াই শুধু কে সবচেয়ে দ্রুত পণ্য পৌঁছে দিতে পারে, তা নয়; বরং কে সবচেয়ে কার্যকরভাবে প্রবৃদ্ধি, খরচ এবং মুনাফার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করবে এই বাজারের ভবিষ্যৎ।
মেটা বর্ণনা: জেপ্টোর প্রায় ৮৪ কোটি ডলারের আইপিও স্থগিত হয়েছে। বাড়ছে লোকসান ও প্রতিযোগিতা, প্রশ্ন উঠছে ভারতের দ্রুত বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















