ক্রিস্টোফার নোলানের ২০১৭ সালের যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ডানকার্ক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনাকে পর্দায় তুলে ধরেছে। ফ্রান্সের ডানকার্ক উপকূল থেকে তিন লাখেরও বেশি মিত্রবাহিনীর সদস্যকে সরিয়ে নেওয়ার সেই ঐতিহাসিক অভিযানকে নোলান দেখিয়েছেন স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—এই তিনটি আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রশ্ন হলো, এত বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মতভাবে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি আসলে ইতিহাসের কতটা কাছাকাছি ছিল?
ক্রিস্টোফার নোলান তখনই হলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত পরিচালক। তাঁর ‘ডার্ক নাইট’ ধারাবাহিকের সাফল্যের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তাঁর নতুন চলচ্চিত্রকে ঘিরে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ডানকার্ক-এ ১৯৪০ সালের গ্রীষ্মে ফ্রান্সের সৈকতে আটকে পড়া মিত্রবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সৈন্যকে উদ্ধার করার কঠিন পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সময়গুলোর একটি ছিল সেটি।
চলচ্চিত্রটির অন্যতম বড় শক্তি ছিল এর অসাধারণ অভিনয় ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ। কেনেথ ব্রানা, টম হার্ডি, মার্ক রাইল্যান্সসহ অভিনেতাদের অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে ছবিটির আবহ ও উত্তেজনাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল হ্যান্স জিমারের সংগীত। সময় ফুরিয়ে আসছে—এমন এক চাপ ও আতঙ্ককে সংগীতের মাধ্যমে পুরো গল্পজুড়ে ধরে রাখা হয়েছিল।
নোলান নিজে প্রথমবারের মতো একাডেমি পুরস্কার না পেলেও ছবিটি তিনটি অস্কার জেতে—চলচ্চিত্র সম্পাদনা, শব্দ মিশ্রণ এবং শব্দ সম্পাদনার জন্য। বিশ্বব্যাপী ছবিটি ৫০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধভিত্তিক সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

সিনেমার চরিত্র, কিন্তু গল্পের শিকড় বাস্তবে
ডানকার্ক-এর বেশিরভাগ প্রধান চরিত্র কাল্পনিক। তবে তাদের অনেক কর্মকাণ্ড ও গল্পের পেছনে রয়েছে বাস্তব ইতিহাসের ছাপ। কেনেথ ব্রানার অভিনয় করা কমান্ডার বোল্টন একটি যৌগিক চরিত্র। তাঁর কিছু কর্মকাণ্ড বাস্তব জীবনের ডানকার্কের পিয়ার-মাস্টার জেমস ক্যাম্পবেল ক্লাউস্টনের কর্মকাণ্ড থেকে নেওয়া হয়েছিল। ক্লাউস্টন নিজেও উদ্ধার অভিযানের সময় প্রাণ হারিয়েছিলেন।
সৈকতে ছড়িয়ে দেওয়া প্রচারপত্র
চলচ্চিত্রের শুরুতেই জার্মান বিমানবাহিনী ডানকার্কের সৈকতে হাজার হাজার প্রচারপত্র ফেলে। এসব প্রচারপত্রে মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। ঘটনাটি বাস্তবেই ঘটেছিল। তবে সিনেমায় ব্যবহৃত প্রচারপত্রের নকশা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক ছিল না। অর্থাৎ ঘটনা সত্য হলেও সেটিকে পর্দায় দেখানোর ক্ষেত্রে নির্মাতারা কিছুটা পরিবর্তন করেছিলেন।

ডানকার্কের ছোট ছোট জাহাজের সত্য কাহিনি
ডানকার্ক থেকে এত বিপুলসংখ্যক সৈন্যকে উদ্ধারের কাজে সাধারণ বেসামরিক নৌযান ব্যবহার করা হয়েছিল—বিষয়টি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি সত্য। প্রায় ৭০০টি ‘ডানকার্কের ছোট জাহাজ’ সৈন্য উদ্ধারে অংশ নিয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিল ৪৩টি মিত্রবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার।
এই ছোট জাহাজগুলো ব্রিটিশ অথবা কানাডীয় ছিল। কিন্তু চলচ্চিত্রে যে জাহাজটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ছিল ফরাসি। ফলে এখানেও বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সিনেমার উপস্থাপনার একটি পার্থক্য রয়েছে।
আকাশে সত্যিকারের যুদ্ধ
চলচ্চিত্রে ব্রিটিশ স্পিটফায়ার ও জার্মান মেসারশমিট বিএফ ১০৯ যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে আকাশযুদ্ধ দেখানো হয়েছে। এ ধরনের বিমানযুদ্ধ ডানকার্ক অভিযানের সময় সত্যিই হয়েছিল।
তবে সিনেমায় জার্মান বিমানগুলোর নাক হলুদ রঙের দেখানো হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে সেটি সঠিক নয়। ডানকার্ক অভিযানের প্রায় এক মাস পর জার্মান বিমানগুলোর নাকে ওই ধরনের হলুদ রং ব্যবহার শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ যুদ্ধের দৃশ্য বাস্তব হলেও বিমানের রঙের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রে সময়গত অসঙ্গতি ছিল।

‘আরএএফ কোথায়?’
চলচ্চিত্রের সৈন্যরা সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স বা আরএএফ তাদের পরিত্যাগ করেছে। কারণ সৈকতে থাকা সৈন্যরা মিত্রবাহিনীর বিমান দেখতে পাচ্ছিল না। ছবিতেও এক হতাশ সৈন্য মরিয়া হয়ে জানতে চায়, আরএএফ কোথায়।
কিন্তু বাস্তবে আরএএফ তাদের পরিত্যাগ করেনি। ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে জার্মানদের বিরুদ্ধে তখনও তারা যুদ্ধ করছিল। সৈকতে থাকা সৈন্যরা সেই আকাশযুদ্ধের পুরো চিত্র দেখতে না পাওয়ায় তাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল।
ইতিহাস ও সিনেমার মাঝের সূক্ষ্ম পার্থক্য
ডানকার্ককে অত্যন্ত বাস্তবধর্মী এবং গভীরভাবে বিস্তারিত একটি যুদ্ধের চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও অনেক ঘটনার ভিত্তি বাস্তব ইতিহাসে। আবার কিছু দৃশ্য, জাহাজ, প্রচারপত্রের নকশা কিংবা যুদ্ধবিমানের রঙের মতো বিষয় চলচ্চিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে।
অর্থাৎ ক্রিস্টোফার নোলান ইতিহাসকে পুরোপুরি বদলে দেননি। বরং বাস্তব ডানকার্ক অভিযানের ঘটনাগুলোকে সিনেমাটিকভাবে তুলে ধরতে কিছু চরিত্র ও দৃশ্য নির্মাণ করেছেন এবং কয়েকটি ঐতিহাসিক উপাদানে পরিবর্তন এনেছেন। সেই কারণে ডানকার্ককে ইতিহাসের হুবহু পুনর্নির্মাণের চেয়ে বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি অত্যন্ত যত্নশীল যুদ্ধচিত্র হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















