গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা সাধারণত এমন এক ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, যেন সংবাদমাধ্যমের প্রধান চ্যালেঞ্জ কেবল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকা। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। সাংবাদিকতা শুধু স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; এটি একই সঙ্গে দায়বদ্ধতা, পেশাগত মান, জনআস্থা এবং সামাজিক কর্তব্যের প্রশ্ন। ফলে একটি গণমাধ্যম কাউন্সিলের নেতৃত্ব বা কাঠামো নিয়ে বিতর্ককে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের স্তরে সীমাবদ্ধ রাখলে মূল বিষয়টি আড়াল হয়ে যায়।
মালয়েশিয়ান মিডিয়া কাউন্সিলের নতুন চেয়ারপারসন নিয়োগকে ঘিরে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তা আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে: সাংবাদিকতা কি কেবল একটি শিল্পখাত, নাকি এটি এমন একটি পেশা যার নিজস্ব নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা থাকা উচিত?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে সাংবাদিকতার ইতিহাস নিরপেক্ষতার দাবি করলেও বাস্তবে সংবাদমাধ্যম কখনও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিল না। প্রতিটি সংবাদ প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে কাজ করে। সংবাদ নির্বাচন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের মূল্যবোধ কাজ করে। ফলে “সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা” অনেক সময় একটি আদর্শিক লক্ষ্য, বাস্তব অবস্থা নয়।
তবে এখানেই সাংবাদিকতার গুরুত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে কেন পেশাগত মানদণ্ড এবং নৈতিক কাঠামো অপরিহার্য। যদি সংবাদমাধ্যমে মতাদর্শ, পক্ষপাত কিংবা স্বার্থের প্রভাব থাকেই, তাহলে সেই প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী পেশাগত নীতিমালা। আর সেই কাজটি কোনো একক সংবাদ প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি স্বশাসিত পেশাগত প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে কার্যকরভাবে করতে পারে।

গণমাধ্যম কাউন্সিলের মূল কাজ হওয়া উচিত সাংবাদিকদের শাস্তি দেওয়া নয়; বরং জনআস্থা রক্ষা করা। এর ভূমিকা হবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সংবাদপেশা বিশ্বাসযোগ্যতা, দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তি, পেশাগত মান রক্ষা এবং নৈতিক আচরণের নির্দেশনা—এসবই সেই দায়িত্বের অংশ।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই প্রয়োজন আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে সংবাদ, মতামত, গুজব এবং ব্যক্তিগত মন্তব্য প্রায় একই প্ল্যাটফর্মে মিশে গেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় পেশাদার সাংবাদিকতার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বা ব্যক্তিনির্ভর তথ্যপ্রচারের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। এই বিভ্রান্তি শুধু সংবাদগ্রাহকদের জন্য নয়, সাংবাদিকতা পেশার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমকে একই বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা এখানেই সমস্যার সৃষ্টি করে। গণমাধ্যম একটি অবকাঠামো বা শিল্পখাত হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতা একটি পেশাগত চর্চা। এই দুইয়ের লক্ষ্য, দায়িত্ব এবং মূল্যায়নের মানদণ্ড এক নয়। তাই একটি কার্যকর গণমাধ্যম কাউন্সিলকে প্রথমেই এই সীমারেখা স্পষ্ট করতে হবে।
একইভাবে সংবাদ প্রতিবেদন এবং মতামতমূলক লেখার মধ্যকার পার্থক্যও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সংবাদ তথ্য সরবরাহ করে, আর মতামত বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা দেয়। যখন এই দুইয়ের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন পাঠকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গণতান্ত্রিক আলোচনাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই কারণেই অনেক দেশে গণমাধ্যম কাউন্সিলের নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা আইনজ্ঞদের দেখা যায়। এর অর্থ এই নয় যে কেবল বিচারকরাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে পারেন। বরং বিচারিক অভিজ্ঞতা প্রায়ই জটিল স্বার্থ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং জনস্বার্থের প্রশ্নে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে অনেক দেশে সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, গবেষক কিংবা জনজীবনে সম্মানিত ব্যক্তিরাও সফলভাবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

অতএব মূল প্রশ্ন ব্যক্তির পেশাগত পরিচয় নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা। একটি গণমাধ্যম কাউন্সিল কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে পারে এবং কতটা কার্যকরভাবে পেশাগত মান রক্ষা করতে পারে—সাফল্যের মাপকাঠি সেখানেই।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশনের পেশা নয়। ঔপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক আধিপত্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা বহু সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে স্বাধীনতার পাশাপাশি আত্মনিয়ন্ত্রণও দরকার। একটি পেশা তখনই পরিপক্ব হয়, যখন সেটি নিজের মানদণ্ড নিজেই নির্ধারণ ও প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তির যুগে এই প্রয়োজন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকতাকে কেবল ব্যবসা বা শিল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে চিকিৎসা, আইন কিংবা অন্যান্য স্বশাসিত পেশার মতোই সুস্পষ্ট নৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
এ. মুরাদ মেরিকান 


















