০৪:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
৯০ কোটি ডলারের রোবট বাজি: ডিপসিক থেকে টেনসেন্ট—চীনের সব বড় শক্তি কেন ইউনিট্রির পাশে? জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হস্তক্ষেপেও থামছে না ইয়েনের পতন, আস্থার সংকটেই কি আসল সমস্যা? থাইল্যান্ড সীমান্ত বন্ধ, জাপানি কোম্পানির ভরসা এখন কম্বোডিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রধানমন্ত্রী: একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল করতে সক্রিয় চীনে গ্রীষ্মের ছুটিতে কোচিংয়ের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষক ‘এক দফা’ কোনো নেতার ঘোষণা নয়, এটি জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: নুরুল হক নুর ১/১১-তে তারেক রহমানকে ‘আয়নাঘরে’ আটকে নির্যাতন: চিফ প্রসিকিউটর কুমিল্লায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২০ কিলোমিটারের বেশি যানজট, দুর্ভোগে যাত্রী-চালক ভারতের পরমাণু সাবমেরিনে নতুন বিপদ: পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে? টাইফুন ডলফিনের তাণ্ডব: জাপানের ওকিনাওয়ায় ৫ আহত, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ১৪ হাজার ভবনে

সময়ের দূরত্বে পিতাকে নতুন করে আবিষ্কার

পরিবারের ভেতরের মানুষদের আমরা প্রায়ই সবচেয়ে কম বুঝি। বিশেষ করে বাবা-মাকে। শৈশবের চোখে তারা হয় নায়ক, নয়তো ব্যর্থতার প্রতীক। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একসময় বুঝতে পারি, মানুষের চরিত্র কোনো একক ঘটনার মধ্যে আটকে থাকে না। সময়, দায়িত্ব, অপূর্ণতা ও সংগ্রাম মিলিয়ে একজন মানুষকে বিচার করতে হয়। আর সেই বিচার অনেক সময় আসে খুব দেরিতে।

অভিবাসী পরিবারের গল্পে সাধারণত সাফল্যের বর্ণনা বেশি থাকে। নতুন দেশে আসা, কঠোর পরিশ্রম, সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যৎ—এসবই পরিচিত আখ্যান। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে যে মানসিক মূল্য দিতে হয়, তা অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। বিশেষ করে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে। তারা প্রায়ই নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেন। বাইরে থেকে দেখলে সেটি দায়িত্ব পালন মনে হয়, কিন্তু ভেতরে থাকে হতাশা, একাকীত্ব এবং ক্রমাগত আত্মসম্মানের সঙ্গে লড়াই।

একজন মানুষ যখন নিজের পরিচিত সমাজ, ভাষা ও পেশাগত মর্যাদা ছেড়ে নতুন দেশে আসেন, তখন তাকে প্রায় নতুন করে জন্ম নিতে হয়। যে ব্যক্তি একসময় সম্মানজনক পদে কাজ করতেন, তাকেই হয়তো নতুন দেশে নেমে আসতে হয় অনেক নিচু অবস্থান থেকে। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি থাকে ভাষাগত অনিশ্চয়তা এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা। পরিবারকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অনেকেই ধীরে ধীরে আবেগগতভাবে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন। বাইরে থেকে তা উদাসীনতা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু অনেক সময় সেটি আসলে ক্লান্তি ও অসহায়তার আরেক নাম।

What It Means To Go No-Contact With a Parent

সন্তানদের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্ন। তারা বাবা-মায়ের সংগ্রামের পুরো প্রেক্ষাপট বোঝে না। তারা শুধু দেখছে ঘরের ভেতরের আচরণ। কে পাশে দাঁড়াল, কে ব্যর্থ হলো, কে শক্ত থাকল না। ফলে বিচারও হয় সরল এবং কঠোর। কোনো বাবা যদি আবেগ প্রকাশে অক্ষম হন, যদি সংকটের সময়ে দুর্বল দেখান, তাহলে সন্তানদের চোখে তিনি সহজেই সম্মান হারাতে পারেন।

কিন্তু মানুষের জীবন সরল রেখায় চলে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানরাও যখন দায়িত্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়, তখন অতীতকে নতুনভাবে পড়তে শেখে। যেসব আচরণ একসময় কাপুরুষতা মনে হয়েছিল, সেগুলোর পেছনে হয়তো দেখা যায় গভীর সহনশীলতা। যেসব নীরবতা অবহেলা বলে মনে হয়েছিল, সেগুলো হয়তো ছিল দায়িত্বের ভারে অবসন্ন একজন মানুষের আত্মরক্ষার উপায়।

বিশেষ করে অবসর জীবনে অনেক মানুষের ভেতরের প্রকৃত সত্তা প্রকাশ পায়। কর্মজীবনের চাপ, উপার্জনের উদ্বেগ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সরে গেলে তারা যেন ধীরে ধীরে নিজেদের কাছে ফিরে আসেন। তখন পরিবারের সদস্যরা আবিষ্কার করেন এমন এক মানুষকে, যাকে তারা আগে কখনও দেখেননি। কঠোর মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোমলতা, অপূর্ণ স্বপ্ন, সৃজনশীলতা কিংবা গভীর ভালোবাসা হঠাৎ করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

এই উপলব্ধির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষকে কোনো একটি সময়ের আচরণ দিয়ে চূড়ান্তভাবে বিচার করা যায় না। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। আধুনিক সমাজে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বীকৃত। নিঃসন্দেহে এমন পরিস্থিতি আছে, যেখানে বিচ্ছেদই সুস্থতার একমাত্র পথ। কিন্তু সব সম্পর্ক কি সেই একই পরিণতির দাবিদার?

7,300+ Sad Son With His Father Stock Photos, Pictures & Royalty-Free Images - iStock

আমরা প্রায়ই ধরে নিই যে পরিবর্তন সম্ভব শুধু নিজের ক্ষেত্রে। আমরা উন্নত হই, পরিণত হই, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করি। অথচ আমাদের চারপাশের মানুষও বদলায়। বাবা-মা বদলান, ভাইবোন বদলায়, সম্পর্কের অর্থ বদলায়। যে মানুষটিকে একসময় আমরা একরকম দেখেছি, বহু বছর পরে তিনি সম্পূর্ণ অন্য একজন হয়ে উঠতে পারেন।

সময়ের সবচেয়ে বড় উপহার সম্ভবত এটাই—এটি আমাদের নতুন চোখ দেয়। সেই চোখে অতীতের মানুষদের আবার দেখা যায়, নতুন অর্থে বোঝা যায়। কখনও কখনও তাতে জন্ম নেয় অনুশোচনা, কখনও কৃতজ্ঞতা। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান হলো এই উপলব্ধি যে মানুষের গল্প কখনও এক অধ্যায়ে শেষ হয় না।

জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে অনেক বাবা-মা আমাদের কাছে নতুন মানুষ হয়ে ওঠেন। আর তখন আমরা বুঝতে পারি, যাদের আমরা বছরের পর বছর ধরে চিনেছি বলে ভেবেছি, তাদের আসলে পুরোপুরি চিনতেই পারিনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

৯০ কোটি ডলারের রোবট বাজি: ডিপসিক থেকে টেনসেন্ট—চীনের সব বড় শক্তি কেন ইউনিট্রির পাশে?

সময়ের দূরত্বে পিতাকে নতুন করে আবিষ্কার

০২:৩৪:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

পরিবারের ভেতরের মানুষদের আমরা প্রায়ই সবচেয়ে কম বুঝি। বিশেষ করে বাবা-মাকে। শৈশবের চোখে তারা হয় নায়ক, নয়তো ব্যর্থতার প্রতীক। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একসময় বুঝতে পারি, মানুষের চরিত্র কোনো একক ঘটনার মধ্যে আটকে থাকে না। সময়, দায়িত্ব, অপূর্ণতা ও সংগ্রাম মিলিয়ে একজন মানুষকে বিচার করতে হয়। আর সেই বিচার অনেক সময় আসে খুব দেরিতে।

অভিবাসী পরিবারের গল্পে সাধারণত সাফল্যের বর্ণনা বেশি থাকে। নতুন দেশে আসা, কঠোর পরিশ্রম, সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যৎ—এসবই পরিচিত আখ্যান। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে যে মানসিক মূল্য দিতে হয়, তা অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। বিশেষ করে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে। তারা প্রায়ই নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেন। বাইরে থেকে দেখলে সেটি দায়িত্ব পালন মনে হয়, কিন্তু ভেতরে থাকে হতাশা, একাকীত্ব এবং ক্রমাগত আত্মসম্মানের সঙ্গে লড়াই।

একজন মানুষ যখন নিজের পরিচিত সমাজ, ভাষা ও পেশাগত মর্যাদা ছেড়ে নতুন দেশে আসেন, তখন তাকে প্রায় নতুন করে জন্ম নিতে হয়। যে ব্যক্তি একসময় সম্মানজনক পদে কাজ করতেন, তাকেই হয়তো নতুন দেশে নেমে আসতে হয় অনেক নিচু অবস্থান থেকে। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি থাকে ভাষাগত অনিশ্চয়তা এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা। পরিবারকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অনেকেই ধীরে ধীরে আবেগগতভাবে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন। বাইরে থেকে তা উদাসীনতা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু অনেক সময় সেটি আসলে ক্লান্তি ও অসহায়তার আরেক নাম।

What It Means To Go No-Contact With a Parent

সন্তানদের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্ন। তারা বাবা-মায়ের সংগ্রামের পুরো প্রেক্ষাপট বোঝে না। তারা শুধু দেখছে ঘরের ভেতরের আচরণ। কে পাশে দাঁড়াল, কে ব্যর্থ হলো, কে শক্ত থাকল না। ফলে বিচারও হয় সরল এবং কঠোর। কোনো বাবা যদি আবেগ প্রকাশে অক্ষম হন, যদি সংকটের সময়ে দুর্বল দেখান, তাহলে সন্তানদের চোখে তিনি সহজেই সম্মান হারাতে পারেন।

কিন্তু মানুষের জীবন সরল রেখায় চলে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানরাও যখন দায়িত্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়, তখন অতীতকে নতুনভাবে পড়তে শেখে। যেসব আচরণ একসময় কাপুরুষতা মনে হয়েছিল, সেগুলোর পেছনে হয়তো দেখা যায় গভীর সহনশীলতা। যেসব নীরবতা অবহেলা বলে মনে হয়েছিল, সেগুলো হয়তো ছিল দায়িত্বের ভারে অবসন্ন একজন মানুষের আত্মরক্ষার উপায়।

বিশেষ করে অবসর জীবনে অনেক মানুষের ভেতরের প্রকৃত সত্তা প্রকাশ পায়। কর্মজীবনের চাপ, উপার্জনের উদ্বেগ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সরে গেলে তারা যেন ধীরে ধীরে নিজেদের কাছে ফিরে আসেন। তখন পরিবারের সদস্যরা আবিষ্কার করেন এমন এক মানুষকে, যাকে তারা আগে কখনও দেখেননি। কঠোর মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোমলতা, অপূর্ণ স্বপ্ন, সৃজনশীলতা কিংবা গভীর ভালোবাসা হঠাৎ করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

এই উপলব্ধির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষকে কোনো একটি সময়ের আচরণ দিয়ে চূড়ান্তভাবে বিচার করা যায় না। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। আধুনিক সমাজে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বীকৃত। নিঃসন্দেহে এমন পরিস্থিতি আছে, যেখানে বিচ্ছেদই সুস্থতার একমাত্র পথ। কিন্তু সব সম্পর্ক কি সেই একই পরিণতির দাবিদার?

7,300+ Sad Son With His Father Stock Photos, Pictures & Royalty-Free Images - iStock

আমরা প্রায়ই ধরে নিই যে পরিবর্তন সম্ভব শুধু নিজের ক্ষেত্রে। আমরা উন্নত হই, পরিণত হই, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করি। অথচ আমাদের চারপাশের মানুষও বদলায়। বাবা-মা বদলান, ভাইবোন বদলায়, সম্পর্কের অর্থ বদলায়। যে মানুষটিকে একসময় আমরা একরকম দেখেছি, বহু বছর পরে তিনি সম্পূর্ণ অন্য একজন হয়ে উঠতে পারেন।

সময়ের সবচেয়ে বড় উপহার সম্ভবত এটাই—এটি আমাদের নতুন চোখ দেয়। সেই চোখে অতীতের মানুষদের আবার দেখা যায়, নতুন অর্থে বোঝা যায়। কখনও কখনও তাতে জন্ম নেয় অনুশোচনা, কখনও কৃতজ্ঞতা। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান হলো এই উপলব্ধি যে মানুষের গল্প কখনও এক অধ্যায়ে শেষ হয় না।

জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে অনেক বাবা-মা আমাদের কাছে নতুন মানুষ হয়ে ওঠেন। আর তখন আমরা বুঝতে পারি, যাদের আমরা বছরের পর বছর ধরে চিনেছি বলে ভেবেছি, তাদের আসলে পুরোপুরি চিনতেই পারিনি।