আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোটগুলো স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে তাদের চরিত্র, দায়িত্ব এবং ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যায়। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারিত্ব এখন এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রশ্নটি শুধু যুদ্ধকালীন অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ (OPCON) কার হাতে থাকবে তা নয়; বরং কীভাবে জোটকে আরও কার্যকর, টেকসই এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী করা যায়।
সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে যুদ্ধকালীন কমান্ড হস্তান্তর প্রক্রিয়ার ওপর বাড়তি নজরদারির উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে বিষয়টি সামরিক প্রস্তুতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে, পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে যেকোনো পরিবর্তন এমনভাবে হতে হবে যাতে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল না হয় এবং নিরাপত্তা কাঠামোতে অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।
তবে নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা এবং রাজনৈতিক বিলম্ব—এই দুইয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য যুদ্ধকালীন কমান্ড গ্রহণের প্রশ্নটি মূলত সার্বভৌমত্বের স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। কয়েক দশক আগে যে বাস্তবতার ভিত্তিতে বর্তমান কমান্ড কাঠামো গড়ে উঠেছিল, আজকের দক্ষিণ কোরিয়া সেই অবস্থায় নেই। বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং উন্নত যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে দেশটি এখন অনেক বেশি আত্মনির্ভর।
এই বাস্তবতায় যুদ্ধকালীন কমান্ড গ্রহণ কোনো প্রতীকী রাজনৈতিক দাবি নয়; বরং রাষ্ট্র হিসেবে পরিপক্বতার স্বাভাবিক প্রতিফলন।
পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিবেশও এ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, উপদ্বীপে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক সম্পদ ভবিষ্যতে চীন-সম্পর্কিত বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে ব্যবহৃত হতে পারে। এই উদ্বেগ জোটবিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আরও স্বাধীন সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত।
তবে আত্মনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা বাস্তব সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না। যুদ্ধকালীন কমান্ড গ্রহণের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত প্রমাণিত সামরিক প্রস্তুতি। উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতা, নজরদারি ব্যবস্থা, সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, শক্তিশালী কমান্ড কাঠামো এবং যৌথ অভিযান পরিচালনার দক্ষতা—এসব ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক সময়সূচি নয়, সামরিক বাস্তবতাই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি।
একই সঙ্গে আরেকটি ঝুঁকিও উপেক্ষা করা যায় না। যদি হস্তান্তর প্রক্রিয়ার শর্ত ও মূল্যায়নের মানদণ্ড ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় কিংবা নতুন নতুন বাধা যুক্ত হতে থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করবে যে, প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি কতটা দৃঢ়। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের ধারণা জোটের প্রতি জনসমর্থন দুর্বল করতে পারে।
আসলে আরও সক্ষম দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো সমস্যা নয়; বরং একটি কৌশলগত সম্পদ। একটি দেশ যখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা দায়িত্বের বড় অংশ বহন করতে সক্ষম হয়, তখন পুরো জোটই শক্তিশালী হয়। এতে বোঝা ভাগাভাগি সহজ হয়, প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও উন্নত হয়।
সুতরাং ওয়াশিংটনের ভূমিকা হওয়া উচিত দক্ষিণ কোরিয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা। গোয়েন্দা সহযোগিতা, উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যৌথ মহড়া এবং কৌশলগত পরামর্শ বিনিময়ের মাধ্যমে এই রূপান্তরকে সফল করা সম্ভব। অন্যদিকে সিউলেরও উচিত নয় বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিক অর্জনের প্রতীক হিসেবে দেখা। সামরিক প্রস্তুতি, স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাই হওয়া উচিত তাদের অগ্রাধিকার।
শেষ পর্যন্ত OPCON হস্তান্তরের সাফল্য নির্ধারিত হবে এটি কত দ্রুত সম্পন্ন হলো তা দিয়ে নয়; বরং এটি দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তাকে কতটা শক্তিশালী করল এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র জোটকে কতটা কার্যকর রাখল, তার ওপর। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক অংশীদারিত্ব, যেখানে উভয় দেশই নিজেদের দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাসী এবং অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যদি সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়, তাহলে এটি কোনো পক্ষের পশ্চাদপসরণ বা বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হবে না। বরং এটি হবে পারস্পরিক আস্থা, যৌথ স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি জোটের স্বাভাবিক পরবর্তী অধ্যায়।
দ্য কোরিয়া টাইমস সম্পাদকীয় বোর্ড 



















