আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির প্রদর্শন দীর্ঘদিন ধরে সামরিক উপস্থিতি, জোট রাজনীতি এবং সরাসরি হস্তক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত ছিল। একটি দেশ যত বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে পারে বা যত দ্রুত সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারে, তাকে তত বেশি প্রভাবশালী বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান সংকট অন্য এক বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। সেখানে চীন এমন একটি কৌশল অনুসরণ করেছে, যা শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে শক্তির সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এক বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল যে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে চীনের সংযমের প্রশংসা করবেন। অথচ ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ঠিক সেটিই ঘটেছে। এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনার নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত মিলেছে।
চীনের অবস্থান ছিল লক্ষণীয়ভাবে নীরব। তারা কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠায়নি, পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়নি কিংবা নতুন কোনো নিরাপত্তা জোটের ডাক দেয়নি। কিন্তু একই সময়ে তারা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেছে এবং আলোচনার পথ খোলা রাখতে কাজ করেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই চীনের বর্তমান বৈদেশিক নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য—ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেটি ব্যবহার করার আগে রাজনৈতিক ফলাফল বিবেচনা করা হয়।
ইরানের ওপর চীনের প্রভাব কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে নয়। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বেইজিংয়ের মতামত তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের একটি, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক চাপে থাকা দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভরসা। ফলে চীনের পরামর্শ সরাসরি চাপের মতো না দেখালেও তা বাস্তবে যথেষ্ট ওজন বহন করে।
এই প্রভাবকে চীন প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেনি। বরং তারা আঞ্চলিক কূটনীতিকে সামনে রেখেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা, বিভিন্ন রাজধানীর সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ রাখা এবং জাতিসংঘে সংকটকে বহুপক্ষীয় আলোচনার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা—এসব পদক্ষেপ দেখায় যে বেইজিং সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে নয়, বরং সমাধানের প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান গড়তে চেয়েছে।
এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যাকে চীন রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেনি। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে—এমন ধারণা থাকা সত্ত্বেও বেইজিং সেখানে নতুন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেনি। বরং তারা এমন বার্তা দিয়েছে যে তাদের উদ্দেশ্য বিদ্যমান শক্তিকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি হিসাবও রয়েছে। চীন জানে যে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। ফলে সংঘাতের বিস্তার রোধ করা তাদের নিজস্ব কৌশলগত প্রয়োজনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে সংযম দেখানোর অর্থ এই নয় যে চীনের সক্ষমতা সীমিত। বরং উল্টোটা সত্য। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে বেইজিং চাইলে আরও দৃশ্যমান ও শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারত। কিন্তু তারা সেই পথ বেছে নেয়নি। এই সিদ্ধান্তই তাদের শক্তির একটি ভিন্ন মাত্রা তুলে ধরে—যেখানে আত্মবিশ্বাস আসে সামর্থ্য থেকে, প্রদর্শন থেকে নয়।
এই ঘটনায় চীনের আরেকটি অর্জন হলো ভাবমূর্তি। বহু দেশ এখন তাদের এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, যারা কেবল নিজেদের মিত্রদের সঙ্গে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গেও কাজ করতে প্রস্তুত। বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা বেইজিংকে একটি দায়িত্বশীল অংশীজন হিসেবে তুলে ধরেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এর প্রভাব রয়েছে। পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কীভাবে চীন আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলা করে। বেইজিংয়ের বার্তা স্পষ্ট—তাদের পছন্দ নাটকীয় শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং ধৈর্যশীল এবং হিসাবি রাষ্ট্রনীতি। এই অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ভুল হতে পারে।
গত কয়েক দশকে বিশ্ব এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত ছিল যেখানে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা প্রায়ই শূন্য-সম ফলাফলের খেলায় পরিণত হতো। একজনের লাভ মানেই অন্যজনের ক্ষতি। চীন অন্তত নিজেদের ভাষ্যে ভিন্ন একটি ধারণা সামনে আনছে। তারা বলছে, প্রভাব বিস্তার এবং সহযোগিতা একে অপরের পরিপন্থী নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে উভয়ই একসঙ্গে সম্ভব।
ইরান সংকট শেষ পর্যন্ত কীভাবে ইতিহাসে মূল্যায়িত হবে, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার: এই সংঘাত দেখিয়েছে যে বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে। সেখানে সব সময় সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ বা সবচেয়ে দৃশ্যমান শক্তিই সবচেয়ে প্রভাবশালী নয়। কখনও কখনও সবচেয়ে কার্যকর রাষ্ট্র সেই, যে জানে কখন সামনে আসতে হয় এবং কখন নীরবে ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে হয়।
সম্ভবত এ কারণেই ইরান সংকটের স্মৃতি শুধু সামরিক সংঘর্ষের জন্য নয়, বরং বড় শক্তির আচরণ সম্পর্কে নতুন ধারণা তৈরির জন্যও আলোচিত হবে। আর সেই আলোচনায় চীনের ভূমিকা থাকবে এমন এক শক্তির উদাহরণ হিসেবে, যে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত, কিন্তু সেটি প্রদর্শনের জন্য অস্থির নয়।
ওয়েনরান জিয়াং 



















