বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির নানা সংকট, যুদ্ধ এবং পরিবর্তনের মধ্যেও শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ আজও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে টিকে আছে। ১৯৭০-এর দশকে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই জোট সময়ের সঙ্গে শুধু অর্থনীতির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
অর্থনৈতিক সংকট থেকে জি-৭-এর জন্ম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্ব ধরে রাখলেও ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। উপনিবেশমুক্ত দেশগুলোর উত্থান, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কারের দাবি এবং তেল সংকট পশ্চিমা অর্থনীতিগুলোকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করে।
১৯৭৩ সালের তেল সংকট শিল্পোন্নত দেশগুলোকে বুঝিয়ে দেয় যে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালে ফ্রান্সে প্রথম বিশ্ব অর্থনৈতিক শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও জাপানকে নিয়ে শুরু হয় ‘গ্রুপ অব সিক্স’। এক বছর পর কানাডা যোগ দিলে এর নাম হয় ‘গ্রুপ অব সেভেন’ বা জি-৭।
অর্থনীতি ছাড়িয়ে কৌশলগত ভূমিকায়
প্রথমদিকে জি-৭ মূলত অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট মোকাবিলার প্ল্যাটফর্ম ছিল। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে এটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট নিয়েও আলোচনা ও সমন্বয়ের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান অভিযান, ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ইরান-ইরাক সংঘাত এবং লেবাননের গৃহযুদ্ধের মতো ঘটনাগুলোতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর অবস্থান সমন্বয়ে জি-৭ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সময়ে জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়গুলোও জোটটির আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
১৯৯০ সালে কুয়েত সংকটের সময় জি-৭ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা প্রদর্শন করে। এর মাধ্যমে জোটটি কেবল অর্থনৈতিক ফোরাম নয়, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে।
রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তি ও বহিষ্কার
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর জি-৭ নতুন রূপ পায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হয় এবং ১৯৯৮ সালে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেয়। তখন এর নাম হয় জি-৮।
তবে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়াকে জোট থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফলে সংগঠনটি আবার জি-৭-এ ফিরে আসে। এরপর থেকে ইউক্রেন সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জোটটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ভূমিকা হয়ে ওঠে।
নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে জি-৭
বর্তমান সময়ে জি-৭-এর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি প্রস্তুতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা।
এসব বিষয়ে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, মিসর, ইউক্রেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশকে সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা, উন্নয়নশীল দেশের ঋণ সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।
বিশ্বব্যবস্থার ধারাবাহিক শক্তি
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে জি-৭। পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় জোটটির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এটি এখনো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্নায়ুযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগ এবং বর্তমান বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যেও জি-৭ তার প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এই জোটের ভূমিকা আগামী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















