ইরান যুদ্ধের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন তেলের সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে ব্যস্ত, তখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীন এক ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হলেও চীন যে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগের মাত্রায় তেল আমদানি শুরু করবে, এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালি প্রায় অচল হয়ে পড়ায় চীনের দৈনিক তেল আমদানি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। তবে এই পরিস্থিতিতেও দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মজুত তেল প্রায় পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বেইজিং তাদের কৌশলগত তেলভাণ্ডার ব্যবহার করেছে বলে কোনো ইঙ্গিত নেই। পাশাপাশি শোধনাগারগুলোর সংরক্ষণ ট্যাংকে গ্যাসোলিন, ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানিও উপচে পড়ছে।
যুদ্ধের আগেই বড় মজুত গড়ে তোলে চীন
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আগে দীর্ঘ সময় ধরে কম দামে অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করেছে চীন। সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার কৌশলের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তাদের বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্তের একটি অংশ তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের মজুত গড়ে তুলতে ব্যবহার করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিদেশি সম্পদ জব্দ করায় বেইজিং বৈদেশিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক অবস্থান নেয়।
দাম বেশি থাকায় আমদানিতে সতর্কতা
বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনো যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে নামেনি। ফলে চীনের তেল কোম্পানিগুলো দাম বিবেচনা করেই ধীরে ধীরে ক্রয় বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের চীনবিষয়ক তেল বিশেষজ্ঞ ফিলিপ অ্যান্ড্রুজ-স্পিড বলেন, চীনা কোম্পানিগুলো মূল্য সংবেদনশীল অবস্থান বজায় রাখবে এবং ধাপে ধাপে ক্রয় বাড়াবে।
অন্যদিকে কেপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক মিউ সু মনে করেন, খুব শিগগির চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় কাঠামোগতভাবে ফিরে যাবে না।
দেশীয় চাহিদা কমেছে
যুদ্ধ চলাকালে চীনের শোধনাগারগুলো করপোরেট মজুতের ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও জ্বালানির চাহিদা কমেছে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি ব্যবহারে সতর্ক হয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসে পেট্রোলচালিত গাড়ির বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
একই সময়ে চীনা সরকার অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে সীমিত করে। এর ফলে এশিয়ার বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেয়। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনকারী দেশে পরিণত হওয়া চীন সাধারণত প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী।
ইরানি তেলের ছাড় হারানোর আশঙ্কা
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া ৬০ দিনের চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে ইরানি তেলের বাজারে। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সহযোগিতা করতে পারে। এতে ইরানি তেলের ওপর যে ব্যারেলপ্রতি ৩ থেকে ১০ ডলার পর্যন্ত ছাড় পেত চীনের ছোট শোধনাগারগুলো, তা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের আগে ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি, অর্থাৎ দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল চীন কিনত বলে কেপলারের হিসাব।
তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো জ্বালানি নীতিতে কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি। বেইজিংয়ের মতে, প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌযান চলাচল সব পক্ষের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের অনেক দেশ তেলের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকলেও পূর্ণ মজুতের কারণে চীন অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ানোর তাগিদ আপাতত দেশটির নেই।
চীনের তেলভাণ্ডার পূর্ণ থাকায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগের মাত্রায় তেল আমদানিতে দ্রুত ফিরছে না বেইজিং।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















