দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ যুদ্ধ থেকে শুরু করে শীতল যুদ্ধ, ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান—এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের নাম জড়িয়ে আছে। মুহূর্তের নোটিশে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে যুদ্ধক্ষেত্রে নামার সক্ষমতার কারণে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত এই ডিভিশন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসাধারণ যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে ৮২তম এয়ারবর্ন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসে। তাদের স্থায়ী ঘাঁটি করা হয় নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে। এরপর বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন অধ্যায়—শীতল যুদ্ধ।
সোভিয়েত হুমকি এবং দ্রুত মোতায়েনের প্রস্তুতি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মিত্রজোটের ঐক্য ভেঙে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকে সংঘাত। পশ্চিম ইউরোপে সোভিয়েত বাহিনী ও তাদের মিত্রদের সম্ভাব্য আগ্রাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে এমন একটি বাহিনীর প্রয়োজন দেখা দেয়, যাদের যুদ্ধের সংকেত পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্ভাব্য সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পাঠানো যাবে। ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন সেই দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনীর অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
কোরীয় যুদ্ধের সময়ও ৮২তমকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়নি। বরং ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত ন্যাটোভুক্ত দেশসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একের পর এক মহড়ায় অংশ নিয়ে তারা যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখে।

তবে পশ্চিম গোলার্ধে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে তাদের ভূমিকা বদলে যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে এই ডিভিশনকে বিভিন্ন অভিযানে পাঠানো হয়।
ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে অভিযান
১৯৬৫ সালের বসন্তে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে বামপন্থী বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র ৮২তম এয়ারবর্নকে সেখানে পাঠায়। ‘অপারেশন পাওয়ার প্যাক’ নামে পরিচিত এই অভিযানে ডিভিশনের সদস্যরা বিদ্রোহ দমন, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে অংশ নেন।
পরবর্তীতে সেখানে নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ তৈরি হয় এবং পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে ৮২তম এয়ারবর্নের অধিকাংশ সদস্য ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফোর্ট ব্র্যাগে ফিরে যায়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ: ‘গোল্ডেন ব্রিগেড’-এর আগমন
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বড় যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি হয় ভিয়েতনামে। ১৯৬৮ সালে টেট আক্রমণ এবং খে সান ঘাঁটির দীর্ঘ অবরোধের পর দক্ষিণ ভিয়েতনামে একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
ভিয়েতনামে মার্কিন সামরিক কমান্ডের প্রধান জেনারেল উইলিয়াম ওয়েস্টমোরল্যান্ড ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের একটি যুদ্ধব্রিগেড পাঠানোর অনুরোধ করেন। অনুমোদন পাওয়ার মাত্র এক দিনের মধ্যে ৮২তম ডিভিশন তাদের তৃতীয় ব্রিগেডকে সংগঠিত করে। এই ব্রিগেড পরে ‘গোল্ডেন ব্রিগেড’ নামে পরিচিত হয়।
ব্রিগেডটি দক্ষিণ ভিয়েতনামের চু লাই অঞ্চলের কাছে মোতায়েন হয়। তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল প্রথম সামরিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা। এরপর তারা হুয়ে ও ফু বাই এলাকায় কমিউনিস্ট যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
পরবর্তীতে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সাইগন, মেকং বদ্বীপ, আয়রন ট্রায়াঙ্গেল এবং কম্বোডিয়া সীমান্তবর্তী অনুপ্রবেশপথগুলোতেও। সেখানে তারা উত্তর ভিয়েতনামের সেনা ও কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।
১৯৬৯ সালের ৪ এপ্রিল স্টাফ সার্জেন্ট ফেলিক্স কনদে ফালকন শত্রুপক্ষের পাঁচটি বাঙ্কার এবং একটি ব্যাটালিয়ন কমান্ড পোস্ট ধ্বংস করার সময় প্রাণ হারান। তার অসাধারণ সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে মৃত্যুর পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘মেডেল অব অনার’ দেওয়া হয়।
প্রায় দুই বছর ভিয়েতনামে যুদ্ধ করার পর ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে ৮২তম এয়ারবর্নের তৃতীয় ব্রিগেড ফোর্ট ব্র্যাগে ফিরে আসে।
গ্রেনাডা ও পানামায় আবার যুদ্ধের ডাক
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ৮২তম এয়ারবর্ন আবারও একাধিক সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
১৯৮৩ সালের অক্টোবরে গ্রেনাডায় ‘অপারেশন আর্জেন্ট ফিউরি’-তে ৩২৫তম পদাতিক রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নকে মাত্র ১৭ ঘণ্টার নোটিশে বিমানযোগে পাঠানো হয়। দেশটির কমিউনিস্টপন্থী বিদ্রোহের মধ্যে বিপদে পড়া মার্কিন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উদ্ধারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও পালন করে তারা।
এরপর ১৯৮৯ সালে পানামায় স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানে অংশ নেয় ৮২তম এয়ারবর্ন। ২০ ডিসেম্বর প্রথম ব্রিগেড পানামা সিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্যারাসুটে অবতরণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই ছিল ডিভিশনটির প্রথম যুদ্ধকালীন প্যারাসুট অবতরণ।
অভিযানে নোরিয়েগার শাসনের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ব্রিগেডটি ফোর্ট ব্র্যাগে ফিরে আসে।
ইরাক যুদ্ধ ও মরুভূমির অভিযান
১৯৯০ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী কুয়েত আক্রমণ করলে মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল আন্তর্জাতিক জোট গড়ে ওঠে। ৮২তম এয়ারবর্নকে ‘অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড’-এ অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর শুরু হয় ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’। শত শত মাইল বিস্তৃত মরুভূমি পেরিয়ে ইরাকি ভূখণ্ডের গভীরে অগ্রসর হয় ৮২তম। মূল আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তারা দ্রুত অগ্রযাত্রায় অংশ নেয়।
মাত্র প্রায় ১০০ ঘণ্টার স্থলযুদ্ধের মধ্যেই ইরাকি বাহিনী ব্যাপকভাবে পরাজিত হয় এবং হাজার হাজার ইরাকি সেনা বন্দি হয়। অভিযান শেষ হওয়ার পর ১৯৯১ সালের এপ্রিলের মধ্যে ডিভিশনের অধিকাংশ সদস্য ফোর্ট ব্র্যাগে ফিরে আসে।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে নতুন অধ্যায়
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্বজুড়ে শুরু হয় দীর্ঘ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। সেই যুদ্ধে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
২০০২ সালের জুনে তৃতীয় ব্রিগেডের সদস্যরা ‘টাস্ক ফোর্স প্যান্থার’-এর সঙ্গে আফগানিস্তানে মোতায়েন হয়। পরবর্তী সময়ে প্রথম ব্রিগেড ও ‘টাস্ক ফোর্স ডেভিল’ সেখানে দায়িত্ব গ্রহণ করে।
২০০৩ সালে ইরাকে শুরু হয় ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’। ৮২তম এয়ারবর্নের বিভিন্ন ইউনিট পর্যায়ক্রমে ইরাকে মোতায়েন হয় এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেখানে যুদ্ধ, নিরাপত্তা, শান্তিরক্ষা ও নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করে।

যুদ্ধের বাইরে মানবিক দায়িত্বও
৮২তম এয়ারবর্নের ইতিহাস শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও এই ডিভিশনকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।
২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ভয়াবহ হারিকেন ক্যাটরিনা আঘাত হানার পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেয় ডিভিশনটি। ২০০৯ সালে হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরও ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সহায়তা করে তারা।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানও চলতে থাকে। ২০০৭ সালের ইরাক যুদ্ধের সেনা বৃদ্ধির কর্মসূচিতেও ৮২তম এয়ারবর্নের প্রথম ও দ্বিতীয় ব্রিগেড অংশ নেয়।
পরবর্তীতে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানেও ডিভিশনের বিভিন্ন ইউনিট অংশ নেয়। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের সময় কাবুল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও পালন করে ৮২তম এয়ারবর্নের সদস্যরা।
শত বছরের ইতিহাসে প্রস্তুতির প্রতীক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্র থেকে শীতল যুদ্ধ, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ভিয়েতনাম, গ্রেনাডা, পানামা, কুয়েত ও ইরাক—তারপর আফগানিস্তান ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান; দীর্ঘ এই ইতিহাসে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের ভূমিকা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।
কখনো তাদের দায়িত্ব ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ, কখনো দ্রুত মোতায়েন হয়ে কোনো অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আবার কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নানা সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ডাকের জবাব দিয়ে আসা এই ডিভিশন তাই শুধু একটি সামরিক ইউনিট নয়; এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তুতির অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।
৮২তম এয়ারবর্নের ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—যে পরিস্থিতিই আসুক, যুদ্ধক্ষেত্র হোক কিংবা মানবিক বিপর্যয়, দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত থাকার ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















