দিল্লির একটি বিক্ষোভে গিয়েছিলেন ৩৮ বছরের গ্রাফিক ডিজাইনার ও শিক্ষক শুবনম। বিক্ষোভটি ছিল ট্রান্সজেন্ডার মানুষের আইনি স্বীকৃতি সংকুচিত করার একটি বিলের বিরুদ্ধে। সবুজ শাড়ি আর ন্যাড়া মাথায় ছিলেন তিনি। এক কনটেন্ট নির্মাতা এসে জানতে চান, কেন তিনি “মেয়েদের পোশাক” পরেছেন। শুবনম তাঁকে সরে যেতে বলেন। কয়েক দিন পর বন্ধুর পাঠানো একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিও দেখে তিনি বুঝতে পারেন, পুরো কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছিল মেটার স্মার্ট চশমায়। চশমাটি দেখতে একেবারে সাধারণ সানগ্লাসের মতো। মার্কিন সাময়িকী এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ এই ঘটনা দিয়ে শুরু করে ভারতে স্মার্ট চশমায় গোপন ভিডিও ধারণের বিপদ তুলে ধরেছে।
সম্পাদনা করে ব্যঙ্গাত্মক রিল বানানো সেই ভিডিও লাখো মানুষ দেখেছে। সঙ্গে এসেছে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া ভিডিও আর এআই দিয়ে বানানো মিম। ভিডিওটি ইনস্টাগ্রাম থেকে এক্স ও ইউটিউবে ছড়িয়েছে, অনেক কপি এখনো অনলাইনে আছে। শুবনম বলেন, “একটি অনুমতিহীন ভিডিও আমার নিজের চেষ্টায় অর্জিত দুই দশকের অগ্রগতি উল্টে দিয়েছে।” তারপর থেকে তিনি পাড়ার বাইরে আর শাড়ি পরেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্ট চশমা যত জনপ্রিয় হবে, এমন ঘটনাও তত বাড়বে। ভারতে গোপন রেকর্ডিং ও অনুমতি ছাড়া ছবি ছড়ানো আগে থেকেই ব্যাপক। সাইবার হয়রানি, যৌন ব্ল্যাকমেইল ও ডিপফেকের ঘটনাও বাড়ছে। এই পরিবেশে স্মার্ট চশমায় গোপন ভিডিও নতুন মাত্রা যোগ করছে, কারণ যন্ত্রটি হাতে ধরে রাখতে হয় না, চোখে থাকলেই চলে।

সমস্যার মূল জায়গা হলো এসব ক্যামেরা দেখতে ক্যামেরার মতো নয়। ফলে যাঁকে রেকর্ড করা হচ্ছে, তিনি টেরই পান না। অক্সফোর্ডের গবেষক ইয়ানুশ শভিয়েরচিনস্কি বলেন, মেটা পথচারীদের সুরক্ষার দায় নিতে চায় না। চশমার ফ্রেমে রেকর্ডিংয়ের সময় একটি ছোট বাতি জ্বলে। কিন্তু সেই বাতি ঢেকে দেওয়ার কৌশল অনলাইনে শেখানো হচ্ছে। বাতি পুরো বিকল করার “গোপন মোড” পরিবর্তনের বাজারও তৈরি হয়েছে। গবেষণা সংস্থা আইডিসির হিসাবে ভারতের পরিধেয় প্রযুক্তির বাজারে স্মার্ট চশমা দ্রুততম বর্ধনশীল পণ্যগুলোর একটি। মেটার সর্বশেষ মডেলের দাম ভারতে ৪২০ ডলার। রিলায়েন্স জিও এ বছরের শেষে ১০৫ ডলারের কম দামের প্রতিদ্বন্দ্বী চশমা আনছে। কড়াকড়ির সম্ভাবনাও কম, কারণ ভারতের পুলিশ নিজেই এআইচালিত নজরদারি চশমা ব্যবহার শুরু করেছে।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কসংকেত স্পষ্ট। দেশে নারীদের অনুমতি ছাড়া ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ফেসবুক ও টিকটকে ছড়ানো এমনিতেই বড় সমস্যা। সস্তা স্মার্ট চশমা বাজারে এলে স্মার্ট চশমায় গোপন ভিডিও ধারণ আরও সহজ হবে। গণপরিবহন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বা বিক্ষোভস্থলে কেউ টেরও পাবে না। সাইবার সুরক্ষা আইনে অনুমতিহীন ছবি প্রকাশের বিষয় থাকলেও নতুন ধরনের যন্ত্র নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম নেই। ভারতের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রযুক্তি আসার আগেই নিয়ম তৈরি করা দরকার। নইলে ক্ষতির বোঝা সবচেয়ে বেশি বইবেন নারী ও প্রান্তিক মানুষ।
শুবনম এখন বাইরে বেরোলে মানুষের চোখের চেয়ে তাদের চশমার দিকে বেশি তাকান। যে পোশাক তিনি দুই দশকের চেষ্টায় প্রকাশ্যে পরতে শিখেছিলেন, তা এখন আবার আলমারিতে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















