অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি দলের পুরো নাম ছিল ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’। দলের নামের মধ্যে ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দটি থাকায় আজও অনেকের মনে প্রশ্ন ওঠে—হিটলার কি সত্যিই সমাজতন্ত্রী ছিলেন? ইতিহাসের দলিল ও নাৎসি শাসনের বাস্তব কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার গভীর পার্থক্য রয়েছে।
নাৎসিবাদের জন্ম যে অস্থির সময়ে
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসে। অন্যদিকে ১৯২২ সালে বেনিতো মুসোলিনি ইতালিতে এমন এক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা নিজেকে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মাঝামাঝি একটি ‘তৃতীয় পথ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।
এই অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশেই জার্মানিতে নাৎসিরা নিজেদের জনপ্রিয় করে তুলতে শুরু করে। তাদের প্রচারে ছিল একদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশায় থাকা মানুষের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানদের জন্য জাতীয় গৌরব ফিরিয়ে আনার আহ্বান।
২৫ দফা কর্মসূচিতে সমাজতান্ত্রিক সুর
১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাৎসিরা তাদের ২৫ দফা কর্মসূচি প্রকাশ করে। সেখানে জাতীয়তাবাদী দাবির পাশাপাশি এমন কিছু বক্তব্য ছিল, যেগুলো বাইরে থেকে দেখলে সমাজতান্ত্রিক বলে মনে হতে পারে।
কর্মসূচিতে শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত নয়—এমন আয়ের বিলোপ, কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণ, সামাজিক কল্যাণের সম্প্রসারণ এবং জমির পুনর্বণ্টনের মতো বিষয়ের কথা বলা হয়েছিল।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই কর্মসূচিকে পরবর্তী নাৎসি শাসনের অর্থনৈতিক নীতির সরাসরি নকশা হিসেবে দেখা ভুল হবে। সে সময় নাৎসি দল ছিল ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী। সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ের জন্য তারা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছিল।
শ্রেণি নয়, জাতিই ছিল হিটলারের রাজনীতির কেন্দ্রে
নাৎসি মতাদর্শে জাতীয়তাবাদ ও তথাকথিত সমাজতন্ত্রকে একসঙ্গে যুক্ত করার প্রধান মাধ্যম ছিল বর্ণবাদ ও ইহুদিবিদ্বেষ।
হিটলারের জাতীয়তাবাদ ছিল জাতিগত জাতীয়তাবাদ। তার কল্পিত জার্মান সমাজে জাতিগতভাবে ‘শুদ্ধ’ জার্মান জনগোষ্ঠীকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য ছিল। এখানে মানুষের সামাজিক শ্রেণির চেয়ে তাদের জাতিগত পরিচয় ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ মার্কসবাদী সমাজতন্ত্র যেখানে শ্রেণিগত বৈষম্য ও শ্রমিকদের স্বার্থকে কেন্দ্রে রাখে, নাৎসিবাদ সেখানে জাতি ও বর্ণকে সমাজ সংগঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

ক্ষমতায় এসেই বদলে গেল নাৎসিদের অবস্থান
হিটলার ১৯৩৩ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়ার পর নাৎসিদের প্রকৃত রাজনৈতিক চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতা ধরে রাখতে তাকে জার্মানির প্রচলিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে প্রুশিয়ার ভূস্বামী ও বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টনের পরিবর্তে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ক্রমেই বড় ব্যবসায়িক স্বার্থকে সমর্থন করতে ব্যবহৃত হতে থাকে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর স্বাধীনতাও দ্রুত ধ্বংস করা হয়।
সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরাই ছিল প্রথম দিকের প্রধান শিকার
হিটলার ক্ষমতায় আসার পরপরই নাৎসিদের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয় সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
১৯৩৩ সালের শুরুতেই রাজনৈতিক বন্দিশিবিরগুলোতে সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট এবং শ্রমিক সংগঠনের সদস্যদের আটক করা শুরু হয়। ফেব্রুয়ারিতে জারি করা রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ড-সংক্রান্ত জরুরি আদেশ কমিউনিস্টদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের পথ খুলে দেয়।
এরপর মে মাসে স্বাধীন শ্রমিক সংগঠনগুলো বিলুপ্ত করে তাদের পরিবর্তে নাৎসি নিয়ন্ত্রিত জার্মান শ্রমফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। জুনে সমাজতান্ত্রিক দলকেও নিষিদ্ধ করা হয়।
অর্থাৎ ক্ষমতায় আসার পর নাৎসিরা সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট রাজনৈতিক শক্তিকে নিজেদের অংশীদার বানায়নি; বরং তাদের নির্মূল করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
নিজেদের দলের ‘বামপন্থীদের’ বিরুদ্ধেও অভিযান
নাৎসি দলের মধ্যেও এমন কিছু নেতা ছিলেন যারা তুলনামূলকভাবে শ্রমিকবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে বামঘেঁষা অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। তাদের মধ্যে গ্রেগর স্ট্রাসার অন্যতম।
১৯৩৪ সালের ‘নাইট অব দ্য লং নাইভস’ অভিযানে হিটলার দলের ভেতরের বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্মম ব্যবস্থা নেন। শ্রমিকশ্রেণিভিত্তিক এসএ বাহিনীর শক্তি ভেঙে দেওয়া হয় এবং দলের বামঘেঁষা অংশও কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
এর মধ্য দিয়ে হিটলার স্পষ্ট করে দেন যে তার কাছে শ্রেণিভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা, জাতীয়তাবাদ এবং জাতিগত মতাদর্শই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ
১৯৪১ সালে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ চালান। এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান আদর্শিক লক্ষ্য ছিল কমিউনিজমকে ধ্বংস করা।
যে নেতা ও দলকে কখনো কখনো তাদের নামের কারণে সমাজতন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তারাই শেষ পর্যন্ত কমিউনিজমের অন্যতম প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছিল।
তাহলে ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট’ নামটি কেন?
হিটলারের দলের নামের ‘সমাজতান্ত্রিক’ অংশটি মূলত রাজনৈতিক প্রচারণার একটি উপাদান ছিল। নাৎসিরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সমর্থন পাওয়ার জন্য অর্থনৈতিক অসন্তোষ, শ্রমিকদের ক্ষোভ এবং সামাজিক নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের প্রচারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

কিন্তু তাদের সমাজতন্ত্র ছিল মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিকৃত ও জাতিগত রূপ। ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থানের পরিবর্তে জাতিগত পরিচয় ছিল এর কেন্দ্রবিন্দু। আর ক্ষমতায় আসার পর এই সীমিত সমাজতান্ত্রিক ভাষাও দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়।
ইতিহাসের বিচারে উত্তর
হিটলার বা নাৎসি দলকে প্রকৃত অর্থে সমাজতান্ত্রিক বলা ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নাৎসি মতাদর্শে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি থাকলেও তা ছিল জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও ইহুদিবিদ্বেষের অধীন একটি বিকৃত রাজনৈতিক ধারণা।
ক্ষমতায় আসার পর হিটলার সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট, শ্রমিক সংগঠন এবং নিজের দলের বামঘেঁষা অংশের বিরুদ্ধেই দমন-পীড়ন চালান। একই সঙ্গে তিনি জার্মানির প্রচলিত অর্থনৈতিক অভিজাত ও বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সহযোগিতা করেন।
তাই ইতিহাসের বিচারে হিটলারকে সমাজতন্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত করার চেয়ে বরং বলা বেশি সঠিক—নাৎসিরা ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটিকে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য ব্যবহার করেছিল, কিন্তু তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ, একনায়কতন্ত্র এবং কমিউনিজমবিরোধিতা।
হিটলারের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায়, কোনো দলের নাম বা প্রচারণার ভাষা দিয়ে তার প্রকৃত মতাদর্শ নির্ধারণ করা যায় না। ক্ষমতায় এসে সে দল কী করেছে—সেটিই তার রাজনৈতিক চরিত্র বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।



















