০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
ইরান যুদ্ধের পর কূটনৈতিক মঞ্চে পাকিস্তানের উত্থান: বিজয় নাকি সাময়িক সুযোগ?  রয়টার্সের প্রতিবেদনঃ  শেখ হাসিনার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সেনা মোতায়েন, নিরাপত্তা জোরদার বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের রাজপথে ক্ষুদ্র উপস্থিতির বিরুদ্ধে সরকারের বিপুল আয়োজন থাইল্যান্ডে বাঁধের জলাধার থেকে উঠল ডেথ রেলওয়ের নিথে স্টেশন: ৪০ বছরের পর দেখা মিলল যুদ্ধকালীন ধ্বংসাবশেষের কিয়ার স্টারমারের বিদায়: দলীয় বিদ্রোহেই প্রধানমন্ত্রীর পতন, নতুন নেতৃত্বের পথে ব্রিটিশ লেবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সুইজারল্যান্ড আলোচনায় অগ্রগতি: ৬০ দিনের রোডম্যাপ, লেবানন যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রশ্নে নতুন কাঠামো কাতারের রাস লাফানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: বার্জান গ্যাস স্থাপনায় ৫৪ আহত, ১৮ নিখোঁজ ‘ককটেল ২’ ঘিরে রশ্মিকা মন্দান্নার আবেগ: ডিয়া রেড্ডি চরিত্রকে বিদায়, বক্স অফিসে শক্ত শুরু কলম্বিয়ায় ডানপন্থী মোড়: ট্রাম্প-সমর্থিত দে লা এস্প্রিয়েলার অল্প ব্যবধানে জয়, ফল চ্যালেঞ্জে বাম শিবির সামরিক বিরতির আগে সেভেন্টিনের আবেগঘন ‘ক্যারেট ল্যান্ড’: তিন বছরের মধ্যে ১৩ জনের ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি

ইরান যুদ্ধের পর কূটনৈতিক মঞ্চে পাকিস্তানের উত্থান: বিজয় নাকি সাময়িক সুযোগ?

চার মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। কে জিতল, কে হারল—এই প্রশ্নের উত্তর যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্রে যতটা স্পষ্ট নয়, কূটনৈতিক অঙ্গনে তা আরও জটিল। তবে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে উঠছে: যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে, যা তাকে এই সংকটের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সুবিধাভোগীতে পরিণত করেছে।

এই বাস্তবতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইরান ও ইসরায়েল, কিন্তু শান্তি আলোচনার শেষ পর্যায়ে দৃশ্যমান ভূমিকায় রয়েছে পাকিস্তান। যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার না হয়েও ইসলামাবাদ নিজেকে এমন একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগের পথ সুগম হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, যেসব রাষ্ট্র সরাসরি সংঘর্ষে জড়িত থাকে না, তারাই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক লাভ তুলে নেয়। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই পুরোনো সত্যকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

কূটনীতির নতুন বাস্তবতা

যুদ্ধের শুরুতে ধারণা ছিল, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, আর সেখানে পাকিস্তান একটি অপরিহার্য সংযোগে পরিণত হয়েছে।

ইসরায়েলের অস্বস্তি এখানেই। কারণ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণকারী আলোচনায় তারা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকলেও দৃশ্যমানভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে না। আলোচনার কাঠামো গড়ে উঠেছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং পাকিস্তানকে ঘিরে। এই চিত্র শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে সূক্ষ্ম পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে।

অনেক বছর ধরে পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকলেও যোগাযোগের বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পথ ছিল। ফলে ইসরায়েলের উদ্বেগ পাকিস্তানের অস্তিত্ব নিয়ে নয়; বরং পাকিস্তানের বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে। ইসলামাবাদ এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে সে পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাকে নিজের নীতিগত অবস্থান বদলাতে হচ্ছে না।

এটাই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অর্জন।

How Pakistan secured 'biggest diplomatic win in years' with Iran ceasefire  | US-Israel war on Iran | The Guardian

ভূগোলের শক্তি

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে ভূগোল বহুবার সামরিক শক্তির চেয়েও বড় সম্পদ হিসেবে কাজ করেছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে।

ইরান, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থান ভোগ করে আসছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিতর্ক—কোনোটিই এই ভূগোলগত গুরুত্ব পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।

ওসামা বিন লাদেনের পাকিস্তানে অবস্থান আবিষ্কার থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘ অবিশ্বাস—সবকিছুর পরও ইসলামাবাদকে পাশ কাটিয়ে আঞ্চলিক কৌশল পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারাবাহিকতারই নতুন সংস্করণ।

পাকিস্তান বুঝতে পেরেছে যে, তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক সংযোগ এমন এক সম্পদ, যা আন্তর্জাতিক সংকটের মুহূর্তে তাকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। ইরান যুদ্ধ সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।

আব্রাহাম চুক্তির বাইরে থেকেও লাভ

একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহ সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেয়নি। কিন্তু তাতেও তার কৌশলগত মূল্য কমেনি।

বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের পথ তৈরি করা এখন অনেক বেশি জরুরি। ফলে পাকিস্তান নিজের অবস্থান অপরিবর্তিত রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভাজন অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পেরেছে।

এটি কূটনৈতিক দরকষাকষির একটি সফল উদাহরণ। ইসলামাবাদ এমন একটি অবস্থান নিয়েছে, যেখানে সে সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো ছাড় দিতে হচ্ছে না।

প্রতীকের রাজনীতি

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতীকী বিষয়গুলোর গুরুত্ব প্রায়ই বাস্তব ফলাফলের সমান হয়ে ওঠে। যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মাটিতে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন হবে না; বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠবে।

বার্তাটি হবে—আঞ্চলিক সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে পাকিস্তান এখনও একটি প্রাসঙ্গিক রাষ্ট্র।

বিশেষ করে যখন ইসরায়েল আলোচনার টেবিলে দৃশ্যমান নয় এবং পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে, তখন সেই প্রতীকী শক্তি আরও বাড়ে। ইসলামাবাদ ভবিষ্যতে এই কূটনৈতিক সাফল্যকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে, এতে সন্দেহ নেই।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই অর্জন কতটা স্থায়ী?

ইতিহাস বলছে, পাকিস্তান অতীতেও আন্তর্জাতিক সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই সুযোগ সবসময় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপান্তরে পরিণত হয়নি। তাই বর্তমান সাফল্যকে স্থায়ী বিজয় হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবের সঙ্গে প্রত্যাশাও বাড়ে। আজ যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সহযোগিতা চাইছে। কিন্তু আগামী দিনে ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের কাছে আরও বড় রাজনৈতিক বা কৌশলগত প্রত্যাশা তুলে ধরতে পারে।

তবুও বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই। ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান এমন একটি কূটনৈতিক অবস্থান অর্জন করেছে, যা তাকে সংঘাত-পরবর্তী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে তুলে ধরেছে। যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক, আপাতত কূটনৈতিক মঞ্চে সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য পাকিস্তানের হাতেই গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধের পর কূটনৈতিক মঞ্চে পাকিস্তানের উত্থান: বিজয় নাকি সাময়িক সুযোগ?

ইরান যুদ্ধের পর কূটনৈতিক মঞ্চে পাকিস্তানের উত্থান: বিজয় নাকি সাময়িক সুযোগ?

০৮:০০:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

চার মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। কে জিতল, কে হারল—এই প্রশ্নের উত্তর যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্রে যতটা স্পষ্ট নয়, কূটনৈতিক অঙ্গনে তা আরও জটিল। তবে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে উঠছে: যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে, যা তাকে এই সংকটের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সুবিধাভোগীতে পরিণত করেছে।

এই বাস্তবতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইরান ও ইসরায়েল, কিন্তু শান্তি আলোচনার শেষ পর্যায়ে দৃশ্যমান ভূমিকায় রয়েছে পাকিস্তান। যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার না হয়েও ইসলামাবাদ নিজেকে এমন একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগের পথ সুগম হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, যেসব রাষ্ট্র সরাসরি সংঘর্ষে জড়িত থাকে না, তারাই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক লাভ তুলে নেয়। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই পুরোনো সত্যকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

কূটনীতির নতুন বাস্তবতা

যুদ্ধের শুরুতে ধারণা ছিল, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, আর সেখানে পাকিস্তান একটি অপরিহার্য সংযোগে পরিণত হয়েছে।

ইসরায়েলের অস্বস্তি এখানেই। কারণ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণকারী আলোচনায় তারা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকলেও দৃশ্যমানভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে না। আলোচনার কাঠামো গড়ে উঠেছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং পাকিস্তানকে ঘিরে। এই চিত্র শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে সূক্ষ্ম পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে।

অনেক বছর ধরে পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকলেও যোগাযোগের বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পথ ছিল। ফলে ইসরায়েলের উদ্বেগ পাকিস্তানের অস্তিত্ব নিয়ে নয়; বরং পাকিস্তানের বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে। ইসলামাবাদ এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে সে পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাকে নিজের নীতিগত অবস্থান বদলাতে হচ্ছে না।

এটাই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অর্জন।

How Pakistan secured 'biggest diplomatic win in years' with Iran ceasefire  | US-Israel war on Iran | The Guardian

ভূগোলের শক্তি

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে ভূগোল বহুবার সামরিক শক্তির চেয়েও বড় সম্পদ হিসেবে কাজ করেছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে।

ইরান, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থান ভোগ করে আসছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিতর্ক—কোনোটিই এই ভূগোলগত গুরুত্ব পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।

ওসামা বিন লাদেনের পাকিস্তানে অবস্থান আবিষ্কার থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘ অবিশ্বাস—সবকিছুর পরও ইসলামাবাদকে পাশ কাটিয়ে আঞ্চলিক কৌশল পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারাবাহিকতারই নতুন সংস্করণ।

পাকিস্তান বুঝতে পেরেছে যে, তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক সংযোগ এমন এক সম্পদ, যা আন্তর্জাতিক সংকটের মুহূর্তে তাকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। ইরান যুদ্ধ সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।

আব্রাহাম চুক্তির বাইরে থেকেও লাভ

একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহ সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেয়নি। কিন্তু তাতেও তার কৌশলগত মূল্য কমেনি।

বরং বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের পথ তৈরি করা এখন অনেক বেশি জরুরি। ফলে পাকিস্তান নিজের অবস্থান অপরিবর্তিত রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভাজন অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পেরেছে।

এটি কূটনৈতিক দরকষাকষির একটি সফল উদাহরণ। ইসলামাবাদ এমন একটি অবস্থান নিয়েছে, যেখানে সে সুবিধা পাচ্ছে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো ছাড় দিতে হচ্ছে না।

প্রতীকের রাজনীতি

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতীকী বিষয়গুলোর গুরুত্ব প্রায়ই বাস্তব ফলাফলের সমান হয়ে ওঠে। যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মাটিতে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন হবে না; বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠবে।

বার্তাটি হবে—আঞ্চলিক সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে পাকিস্তান এখনও একটি প্রাসঙ্গিক রাষ্ট্র।

বিশেষ করে যখন ইসরায়েল আলোচনার টেবিলে দৃশ্যমান নয় এবং পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে, তখন সেই প্রতীকী শক্তি আরও বাড়ে। ইসলামাবাদ ভবিষ্যতে এই কূটনৈতিক সাফল্যকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে, এতে সন্দেহ নেই।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই অর্জন কতটা স্থায়ী?

ইতিহাস বলছে, পাকিস্তান অতীতেও আন্তর্জাতিক সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই সুযোগ সবসময় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপান্তরে পরিণত হয়নি। তাই বর্তমান সাফল্যকে স্থায়ী বিজয় হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবের সঙ্গে প্রত্যাশাও বাড়ে। আজ যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সহযোগিতা চাইছে। কিন্তু আগামী দিনে ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের কাছে আরও বড় রাজনৈতিক বা কৌশলগত প্রত্যাশা তুলে ধরতে পারে।

তবুও বর্তমান বাস্তবতায় একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই। ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান এমন একটি কূটনৈতিক অবস্থান অর্জন করেছে, যা তাকে সংঘাত-পরবর্তী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে তুলে ধরেছে। যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক, আপাতত কূটনৈতিক মঞ্চে সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য পাকিস্তানের হাতেই গেছে।