স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের আলোচনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রোটিন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে পুষ্টিবিদরা বলছেন, সুস্বাস্থ্যের জন্য ফাইবারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অধিকাংশ মানুষ পর্যাপ্ত প্রোটিন পেলেও দৈনিক প্রয়োজনীয় ফাইবার গ্রহণ করতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন খাবার খুব বেশি নেই যেখানে একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রোটিন ও ফাইবার পাওয়া যায়। সাধারণত মাছ, মাংস বা মুরগির মতো প্রাণিজ খাদ্যে প্রোটিন থাকলেও ফাইবার থাকে না। আবার ফল ও সবজিতে ফাইবার থাকলেও প্রোটিনের পরিমাণ তুলনামূলক কম।
তাই যেসব খাবারে এই দুই পুষ্টিগুণ একসঙ্গে রয়েছে, সেগুলো শরীরের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। এগুলো দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে, পেশির স্বাস্থ্য রক্ষা করে, অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিনের সীমিত ক্যালোরির মধ্যে থেকেই শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে চাইলে প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ডালজাতীয় খাদ্য: পুষ্টির শক্তিশালী উৎস
ছোলা, মসুর ডাল, মটরশুঁটি, রাজমা, কালো শিমসহ বিভিন্ন ডালজাতীয় খাদ্য প্রোটিন ও ফাইবারের অন্যতম সেরা উৎস। আধা কাপ রান্না করা মসুর ডালে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন এবং ৮ গ্রাম ফাইবার থাকে। একই পরিমাণ রান্না করা কালো শিমে থাকে প্রায় ৭.৫ গ্রাম প্রোটিন ও সমপরিমাণ ফাইবার।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ডালজাতীয় খাদ্য খান তাদের ওজন তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা কম থাকে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
সয়াবিন ও সয়া-ভিত্তিক খাবার
এডামামে, টোফু, টেম্পে ও সয়া দুধের মতো খাবারকে পুষ্টিবিদরা প্রায় ‘সম্পূর্ণ খাদ্য’ বলে মনে করেন। এগুলোতে উচ্চমাত্রার প্রোটিনের পাশাপাশি হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডও রয়েছে।
আধা কাপ এডামামে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন ও ৪ গ্রাম ফাইবার সরবরাহ করে। একই পরিমাণ টোফুতে প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ২২ গ্রাম এবং ফাইবার ৩ গ্রাম। এক কাপ সয়া দুধে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিনের সঙ্গে ১.৫ গ্রাম ফাইবারও পাওয়া যায়।
বাদাম: ছোট খাবার, বড় উপকার
চীনাবাদাম, কাঠবাদাম, আখরোট ও কাজুবাদামের মতো বাদামজাতীয় খাদ্য প্রোটিন ও ফাইবারের ভালো উৎস। এক আউন্স চীনাবাদামে প্রায় ৭.৫ গ্রাম প্রোটিন ও ২.৫ গ্রাম ফাইবার থাকে। একই পরিমাণ কাঠবাদামে থাকে ৬ গ্রাম প্রোটিন ও ৩.৫ গ্রাম ফাইবার।
নিয়মিত বাদাম খাওয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর ওজন, হৃদ্রোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এছাড়া এতে রয়েছে উপকারী চর্বি, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, বি-ভিটামিন এবং ভিটামিন-ই-এর মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
বীজজাতীয় খাবারের বাড়তি শক্তি
চিয়া বীজ, তিসি বীজ ও কুমড়ার বীজের মতো খাবারও প্রোটিন ও ফাইবারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে চিয়া ও তিসি বীজে ফাইবার এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি।
এক আউন্স কুমড়ার বীজে প্রায় ৮.৫ গ্রাম প্রোটিন ও ২ গ্রাম ফাইবার থাকে। একই পরিমাণ চিয়া বীজে প্রায় ৫ গ্রাম প্রোটিনের পাশাপাশি ১০ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বীজজাতীয় খাদ্য খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।

সম্পূর্ণ শস্য: দৈনন্দিন খাদ্যের সহজ সমাধান
ওটস, কুইনোয়া, ব্রাউন রাইস, ফারো এবং পূর্ণ শস্যের আটা দিয়ে তৈরি রুটি ও ক্র্যাকার সম্পূর্ণ শস্যের অন্তর্ভুক্ত। এসব খাদ্যে শস্যের সব অংশ অক্ষত থাকে, ফলে পুষ্টিগুণও বেশি থাকে।
আধা কাপ ওটস দিয়ে তৈরি ওটমিলে প্রায় ৬ গ্রাম প্রোটিন ও ৫ গ্রাম ফাইবার থাকে। এক কাপ রান্না করা কুইনোয়ায় পাওয়া যায় প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন ও ৫ গ্রাম ফাইবার।
গবেষণায় সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাদ্যের সঙ্গে উন্নত অন্ত্রস্বাস্থ্য, হৃদ্রোগের ঝুঁকি হ্রাস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
প্রোটিন ও ফাইবার—দুটি পুষ্টিগুণই শরীরের জন্য অপরিহার্য। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডাল, সয়া-জাতীয় খাবার, বাদাম, বীজ এবং সম্পূর্ণ শস্য যুক্ত করলে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।




















