বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চীনে সরকারি সফর করবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হবে তার প্রথম চীন সফর। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ১৭তম নিউ চ্যাম্পিয়নস বার্ষিক সম্মেলনেও অংশ নেবেন। ব্যস্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ এই সফরসূচি স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সফরকালে চীন ও বাংলাদেশ একাধিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করবে। এটি দুই দেশের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক আস্থা এবং সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনারই প্রতিফলন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব দেশের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করা এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
চীন টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। বর্তমানে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং সম্মিলিতভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশি পণ্যের শতভাগ শুল্ক লাইনে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে চীন, যা বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপ জোরদার করা।
এই সফর চীন ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার বৃহত্তর চিত্রও তুলে ধরে। চলতি মাসেই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং চীন সফর করেছেন। সফর শেষে দুই দেশ চীন-মিয়ানমার অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায় গঠনের গতি বাড়ানোর বিষয়ে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
গত মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীন সফর করেন। ওই সফরে দুই দেশের নেতারা নতুন যুগে আরও ঘনিষ্ঠ চীন-পাকিস্তান অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায় গঠনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একমত হন।
এছাড়া তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান এবং ব্রুনাইয়ের যুবরাজ হাজি আল-মুহতাদী বিল্লাহ ধারাবাহিকভাবে চীন সফর করেছেন। এসব সফরে জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং অন্যান্য খাতে সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এপ্রিল মাসে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাষ্ট্রপতি তো লাম চীন সফর করেন। সফরকালে সীমান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ এবং ডিজিটাল শিল্প নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন সমঝোতা হয়।

দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য সামার দাভোস ফোরামেও প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতারা অংশ নেবেন। সাম্প্রতিক সময়ের এই ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের সফরগুলো দেখায় যে, অনেক দেশই চীনের উন্নয়ন থেকে উদ্ভূত সুযোগগুলো কাজে লাগাতে আগ্রহী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরও সেই বৃহত্তর ধারারই অংশ।
বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রভাবেও পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে চীনের ধারাবাহিক নীতিগত অবস্থান।
তবে আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ভারত নয়, চীনে হওয়ায় কিছু ভারতীয় গণমাধ্যম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিছু ভারতীয় বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন যে, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে তারেক রহমান প্রতিবেশী ভারতকে পাশ কাটিয়ে চীনকে বেছে নিয়েছেন। তারা হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতকে অগ্রাধিকার দেয়নি।
আবার কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, পানি ব্যবস্থাপনায় চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা নয়াদিল্লির জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল বিষয় হতে পারে।
এই ধরনের মন্তব্যের পেছনে কিছু মানুষের ‘বড় ভাই’ মানসিকতা কাজ করছে। তারা মনে করেন, প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতার প্রথম বিদেশ সফর যেন আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তির প্রতি আনুগত্যের প্রতীক। ফলে অন্য দেশের স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে তারা নিজেদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
বাস্তবে, চীন যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, তেমনি ভারতের সঙ্গেও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। চীন ও ভারতের উচিত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং একে অপরের সাফল্যের অংশীদার হওয়া—যা অনেকেই ‘ড্রাগন-এলিফ্যান্ট ট্যাঙ্গো’ নামে উল্লেখ করেন।
একই সময়ে, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকেও চীন স্বাগত জানায়। এসব সম্পর্ক একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম, যা সংশ্লিষ্ট সব দেশের জন্য লাভজনক হবে।
চীন সবসময় উন্মুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতার পক্ষে। চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর কিংবা চীন-বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব—কোনোটিই কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়। বরং এগুলো পারস্পরিক লাভজনক বহুপক্ষীয় সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত।
তিস্তা নদী প্রকল্পকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। ভারত ও বাংলাদেশ উজান-ভাটির দেশ, অন্যদিকে চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর জলপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং বন্যা তথ্য বিনিময়ের মতো বিষয়েও ভারতের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। ফলে এ খাতে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার যথেষ্ট সম্ভাবনা বিদ্যমান।
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা একটি সুস্পষ্ট প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিন্ন লক্ষ্য হলো মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা।
চীন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি এবং সব দেশের সমতার নীতিতে অটল রয়েছে। দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে প্রস্তুত।
চীন যখন তার ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০) বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই উন্নয়নের সুফল ক্রমেই প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছেও পৌঁছাবে। আমরা বিশ্বাস করি, দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ এতটাই বিস্তৃত যে সেখানে সব দেশের মধ্যে আরও গভীর সহযোগিতা, যৌথ সমৃদ্ধি এবং পারস্পরিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
গ্লোবাল টাইমস এর সম্পাদকীয় 























