ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পাকিস্তান। এই কূটনৈতিক সাফল্যের ফলে দেশটির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই অর্জন কি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ সহজ করতে পারবে?
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান অংশ নেন। কয়েক মাস ধরে চলা মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। অনেক বিশ্বনেতা ইসলামাবাদকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অর্থনৈতিক সুযোগের নতুন সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক সাফল্য পাকিস্তানের জন্য নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ সংকট এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা।
সরকার আগামী অর্থবছরে ৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নীতিনির্ধারকদের আশা, আন্তর্জাতিক আস্থার উন্নতি হলে অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি, শিল্প এবং প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার সুযোগও বাড়বে।
বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হলে পাকিস্তান আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহন, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
বিশ্লেষকরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ২০০১ সালের পরও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছিল। সে সময় ঋণ পুনর্গঠন, বহুপক্ষীয় আর্থিক সহায়তা এবং বিদেশি সমর্থনের সুযোগ তৈরি হলেও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশটি সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।

তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির একটি বড় পার্থক্য হলো এবার পাকিস্তান সংঘাতের অংশ নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। ফলে দেশটির কূটনৈতিক প্রভাব আগের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
সংস্কার ছাড়া সংকট কাটবে না
অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন, কূটনৈতিক সাফল্য ইতিবাচক হলেও তা একা অর্থনীতির গভীর সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, দুর্বল রপ্তানি সক্ষমতা, সীমিত করভিত্তি, সামাজিক বৈষম্য এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ এখনো পাকিস্তানের বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের মতে, বিদেশি সহায়তা বা সাময়িক আর্থিক সুবিধার চেয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিক্ষা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
শান্তিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার সুযোগ এখন পাকিস্তানের সামনে রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংস্কার, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিলেও স্থায়ী উন্নতির জন্য কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















