ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে চলমান তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়ে জুন মাসের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা দেশটির জন্য এক বিরল ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে স্কুল, পরিবহন ও জনসেবামূলক বিভিন্ন খাতে ব্যাপক বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার সারের উইসলিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৪.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও তা ১৯৭৬ সালে সাউদাম্পটনে রেকর্ড হওয়া জুন মাসের ৩৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে ছাড়াতে পারেনি, আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বুধবার ও বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
জুনের রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষা
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সবচেয়ে উষ্ণ দিন হতে পারে বৃহস্পতিবার, যখন তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে ৪০ ডিগ্রি স্পর্শ করার সম্ভাবনাও প্রায় ৩০ শতাংশ।

২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল। সেই সময় দাবানলে লন্ডন ও কেন্টে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
লাল সতর্কতায় বড় অঞ্চল
ইস্ট ও ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস, পূর্ব ইংল্যান্ড, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড, লন্ডন এবং দক্ষিণ ওয়েলসের কিছু অংশে লাল সতর্কতা জারি রয়েছে। এই সতর্কতা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
এ ছাড়া ওয়েলসের বেশিরভাগ এলাকা এবং উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডে জারি করা হয়েছে অ্যাম্বার সতর্কতা, যা বিশেষ করে বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বাড়তি সতর্কতার বার্তা বহন করে।
স্কুল ও পরিবহনে প্রভাব
তীব্র গরমের কারণে শত শত স্কুল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোথাও শিক্ষার্থীদের আগেভাগে ছুটি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও ইউনিফর্মের নিয়ম শিথিল করা হয়েছে।
সোমারসেট, বাকিংহামশায়ার ও গ্লস্টারশায়ারের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। যদিও শিক্ষা বিভাগ বলেছে, সাধারণত গরমের কারণে স্কুল বন্ধের পরামর্শ দেওয়া হয় না।

অন্যদিকে নিরাপত্তার স্বার্থে চিলটার্ন রেলওয়েজ মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাদের অর্ধেকের বেশি ট্রেন চলাচল বাতিল করেছে। গাড়িচালকদেরও অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মানুষ ও প্রকৃতির ওপর চাপ
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নদী ও হ্রদের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ওয়েলসের স্নোডোনিয়া অঞ্চলে মাছ রক্ষার জন্য একটি হ্রদ থেকে নদীতে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পোষা প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রাণীকল্যাণ সংস্থাগুলো দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে কুকুর হাঁটাতে নিষেধ করেছে। গত বছর পোষা প্রাণীর হিটস্ট্রোকের ঘটনা ২৮ শতাংশ বেড়েছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
কেন এত তীব্র এই তাপপ্রবাহ?
আবহাওয়াবিদদের মতে, ইউরোপের ওপর স্থির হয়ে থাকা একটি উচ্চচাপ বলয় বা ‘ওমেগা ব্লক’ এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এটি কার্যত একটি ‘হিট ডোম’ তৈরি করেছে, যার ফলে গরম বাতাস আটকে পড়েছে এবং নতুন আবহাওয়া ব্যবস্থা প্রবেশ করতে পারছে না।

এর সঙ্গে সাহারা মরুভূমি থেকে উত্তর দিকে উঠে আসা উষ্ণ বায়ুও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে আর্দ্রতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার শুধু তাপমাত্রাই নয়, বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতাও বড় উদ্বেগের কারণ। আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম দ্রুত শুকাতে পারে না, ফলে স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এতে হিটস্ট্রোক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, তাপপ্রবাহ এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং ব্রিটিশ গ্রীষ্মের নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। আবহাওয়া অফিসের এক সম্ভাব্য পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫৬ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পৌঁছানোর পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্কের মধ্যেই দেশটির সংসদে আগামী জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে গবেষকেরা এই রেকর্ড তাপপ্রবাহে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভূমিকা নিয়ে নতুন গবেষণা প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















