বিশ্বজুড়ে ব্যাটারি শিল্পে ব্যবহৃত প্রধান ধাতু—লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের বাজারে দীর্ঘ মন্দার পর আবার প্রাণ ফিরছে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধিকে নতুন চক্রের সূচনা হিসেবে দেখার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বাজার কি সত্যিই এত শক্তিশালী যে এই উচ্চ মূল্যকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে পারবে?
সাম্প্রতিক মূল্য পুনরুদ্ধারের পেছনে চাহিদার বিস্ফোরণ নয়, বরং সরবরাহের সংকোচনই বেশি কাজ করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম কোবাল্ট উৎপাদক কঙ্গো রপ্তানি সীমিত করেছে। নিকেলের প্রধান উৎস ইন্দোনেশিয়া উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে কোটা ব্যবস্থা কঠোর করেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের নিম্নমূল্যের কারণে লিথিয়াম শিল্পে নতুন বিনিয়োগ কমেছে এবং কিছু বড় প্রকল্পও স্থগিত হয়েছে। চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লিথিয়াম খনির কার্যক্রম বন্ধ হওয়াও বাজারকে আরও আঁটসাঁট করেছে।
অর্থাৎ, বাজারে যে স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে, তা মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ফল। ফলে ভবিষ্যতের দামের গতিপথ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। কিনশাসা, জাকার্তা কিংবা চীনের প্রাদেশিক প্রশাসনের একটি সিদ্ধান্তই বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সরবরাহের এই নিয়ন্ত্রণের আড়ালে আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। ব্যাটারির ব্যবহার বিশ্বব্যাপী এখনও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার ২০২০ সালের তুলনায় ছয় গুণে পৌঁছেছে। এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি বৈদ্যুতিক গাড়ি, যা মোট ব্যাটারি ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশ।
কিন্তু চলতি বছরে সেই ইভি বাজারেই ধীরগতির লক্ষণ স্পষ্ট। ২০২৫ সালে যেখানে বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কার্যত স্থবির। এর পেছনে বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কর-প্রণোদনা প্রত্যাহারের ফলে ইভি বিক্রি কমেছে। চীনেও বিক্রি হ্রাস পেয়েছে, যদিও বড় আকারের গাড়ির দিকে ঝোঁক বাড়ায় প্রতিটি গাড়িতে বেশি ব্যাটারি ব্যবহারের মাধ্যমে চাহিদার একটি অংশ ধরে রাখা গেছে। বিপরীতে ইউরোপে বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে এবং এশিয়ার বহু দেশে চীনা নির্মাতাদের রপ্তানি বাড়ায় বিক্রিও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থাৎ বৈশ্বিক বাজারের সামগ্রিক চিত্র বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কোথাও প্রবৃদ্ধি থেমে যাচ্ছে, কোথাও আবার নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। ফলে কেবল একটি সংখ্যা দেখে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা কঠিন।
এদিকে ব্যাটারি শিল্পের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বিদ্যুৎ গ্রিডে ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। সূর্য বা বাতাসের অনিয়মিত উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে বড় আকারের ব্যাটারি স্টোরেজ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে চীন দ্রুতগতিতে শক্তি সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণে দেশটি আগামী কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি স্থাপন করতে চায়। ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাইরে ব্যাটারির আরেকটি বড় বাজার তৈরি হচ্ছে।
তবে এই নতুন চাহিদা সব ধরনের ব্যাটারি ধাতুর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করছে না। বিদ্যুৎ সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট বা এলএফপি প্রযুক্তি, যেখানে কোবাল্ট কিংবা নিকেলের প্রয়োজন হয় না। ফলে লিথিয়ামের জন্য এটি ইতিবাচক হলেও অন্য দুটি ধাতুর জন্য একই সুবিধা তৈরি হচ্ছে না।
আসলে ব্যাটারি প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এখন কেবল উৎপাদনের নয়, রসায়নেরও। কম খরচে, বেশি নিরাপদ এবং অধিক কার্যকর প্রযুক্তির সন্ধানে নির্মাতারা প্রতিনিয়ত নতুন সমাধান খুঁজছেন। বর্তমানে এলএফপি প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে থাকলেও পশ্চিমা অনেক গাড়ি নির্মাতা এখনও পুরোপুরি এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে চাইছে না, কারণ এর সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।
এ অবস্থায় কোবাল্ট ও নিকেলের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। যাত্রীবাহী বৈদ্যুতিক গাড়িতে এই দুই ধাতুর ব্যবহার আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে বাজারের ভারসাম্য যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, ধাতুর দাম বাড়লে ব্যাটারির উৎপাদন খরচও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় গিয়ে পড়ে ভোক্তা কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর। ইতোমধ্যেই লিথিয়াম কার্বোনেটের মূল্যবৃদ্ধি অনেক প্রকল্পের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে চাপে ফেলছে। দাম আরও বাড়তে থাকলে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া কিংবা চাহিদা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
এই কারণেই সাম্প্রতিক মূল্য পুনরুদ্ধারকে নতুন সুপার-সাইকেলের সূচনা হিসেবে দেখা কঠিন। বরং বাজার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সরবরাহ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, সরকারি নীতি এবং বৈশ্বিক চাহিদা—সবকিছু একসঙ্গে মূল্য নির্ধারণ করছে।
আগে ব্যাটারি ধাতুর বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সরবরাহ ও চাহিদার অসামঞ্জস্য। এখন সেই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনীতি, শিল্পনীতি এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা। ফলে সামনে যে বাজার তৈরি হচ্ছে, সেটি হয়তো আগের চেয়ে আরও পরিণত, কিন্তু একই সঙ্গে অনেক বেশি অনিশ্চিত।
অ্যান্ডি হোম 



















