দক্ষিণ কোরিয়ায় হয়রানির শিকার ব্যক্তিরা এখন আদালতের নজরদারিতে থাকা অনুসরণকারীর অবস্থান মুঠোফোনের অ্যাপে দেখতে পারবেন। নতুন ব্যবস্থাটি ইলেকট্রনিক গোড়ালি বন্ধনী থেকে অবস্থানের তথ্য নেবে। অনুসরণকারী কাছে এলে শুধু সতর্কবার্তা নয়, মানচিত্রে তার চলাচলও দেখা যাবে। কর্তৃপক্ষের আশা, এতে ভুক্তভোগী নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য বেশি সময় পাবেন। প্রয়োজনে পুলিশের সাড়াও দ্রুত হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসরণকারী শনাক্তের অ্যাপ নিরাপত্তার সহায়ক হলেও একে পূর্ণ সুরক্ষা ভাবার সুযোগ নেই। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের প্রতিবেদনে নতুন সুবিধা এবং সংশয় দুটিই তুলে ধরা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আগের ব্যবস্থায় নজরদারিতে থাকা ব্যক্তি নির্দিষ্ট দূরত্বে এলে ভুক্তভোগীর কাছে বার্তা যেত। সেই বার্তায় সঠিক অবস্থান দেখা যেত না। ফলে কোন পথে সরে গেলে নিরাপদ হওয়া যাবে, তা বোঝা কঠিন ছিল। সংশোধিত ইলেকট্রনিক নজরদারি আইনের ভিত্তিতে নতুন অ্যাপটি তৈরি হয়েছে। পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর এটি চালু করা হয়েছে। কেবল আদালতের নির্দেশে ইলেকট্রনিক বন্ধনী পরা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা কাজ করবে। অর্থাৎ সব অভিযোগ বা সব অনুসরণকারীর অবস্থান দেখা যাবে না। অনুসরণকারী শনাক্তের অ্যাপ ব্যবহারের আগে ভুক্তভোগীর সম্মতি, তথ্য পাওয়ার যোগ্যতা এবং পুলিশের সহায়তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবস্থাটির শক্তি হলো, এটি অস্পষ্ট বিপদকে দৃশ্যমান তথ্য দেয়। একজন ব্যক্তি কাছে আছেন কি না, কোন দিক থেকে আসছেন এবং দূরত্ব বাড়ছে কি না, তা জানা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এখানেই নতুন চাপ তৈরি হয়। ভুক্তভোগীকে বারবার মানচিত্র দেখতে হলে ভয় ও মানসিক চাপ বাড়তে পারে। অবস্থান সামান্য দেরিতে হালনাগাদ হলে ভুল নিরাপত্তাবোধও জন্মাতে পারে। মুঠোফোনের সংযোগ, ব্যাটারি এবং তথ্যের নির্ভুলতার ওপর নির্ভরতা থাকবে। অনুসরণকারী শনাক্তের অ্যাপ তাই পুলিশি পাহারা, নিরাপদ আশ্রয়, আদালতের সুরক্ষা আদেশ কিংবা অভিযুক্তের আচরণ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নয়। প্রযুক্তির কাজ হবে প্রতিক্রিয়ার সময় বাড়ানো, দায় ভুক্তভোগীর হাতে সরিয়ে দেওয়া নয়।

বাংলাদেশেও নারী ও সাবেক সঙ্গীর অনুসরণ, হুমকি এবং অনলাইন নজরদারির অভিযোগ নিয়মিত সামনে আসে। অনেক ঘটনায় প্রকাশ্য হামলার আগে দীর্ঘ সময় ধরে ফোন, সামাজিক মাধ্যম বা শারীরিক অনুসরণ চলতে পারে। অভিযোগ নথিভুক্ত হলেও ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ এবং দ্রুত সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা সীমিত। দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল হুবহু প্রয়োগের আগে আইনি আদেশ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং পুলিশের সক্ষমতা দরকার হবে। কার অবস্থান দেখা যাবে, কতদিন সংরক্ষণ হবে এবং ভুল অভিযোগে কী প্রতিকার থাকবে, সেগুলোও স্পষ্ট করতে হবে। অনুসরণকারী শনাক্তের অ্যাপ নিয়ে বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি তখনই কার্যকর যখন তার সঙ্গে নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া যুক্ত থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন ব্যবস্থার ফল বোঝার জন্য কয়েকটি তথ্য সামনে দরকার হবে। কতজন ভুক্তভোগী অ্যাপ ব্যবহার করেন, কতবার সতর্কতার পর পুলিশি সহায়তা লাগে এবং হামলা প্রতিরোধ হয় কি না, সেগুলোই কার্যকারিতা মাপবে। আগের বার্তা শুধু নৈকট্য জানাত। নতুন মানচিত্র চলাচলের দিক দেখাতে পারে। এই ছোট পার্থক্যই বিপদের সময় সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়াবে কি না, সেটি এখন পরীক্ষা হবে। একই সঙ্গে নজর রাখতে হবে, মানচিত্র যেন নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে বাস্তব পুলিশি সুরক্ষার ঘাটতি আড়াল না করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















