থাইল্যান্ডে বিদেশি শিশুদের নাগরিকত্ব পাইয়ে দিতে স্থানীয় পুরুষদের বাবা হিসেবে নিবন্ধনের অভিযোগে বড় তদন্ত শুরু হয়েছে। ড্রাগন স্কেল নামের অভিযানে ৪০টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং ৫৩টি তল্লাশি পরোয়ানা নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীরা আগে ১৬৪ চীনা শিশুর জন্মনিবন্ধনে সন্দেহজনক মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি শুধু নথি জালিয়াতি থাকবে না। সম্পত্তি ধারণ, অর্থ স্থানান্তর এবং সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থার অপব্যবহারের প্রশ্নও সামনে আসবে। থাই কর্তৃপক্ষ বলছে, ভুয়া পিতৃত্ব নেটওয়ার্কটির সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যোগ থাকতে পারে। দ্য নেশন থাইল্যান্ডের প্রতিবেদনে তদন্তের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাগুলো পাঁচটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জারি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন বেসরকারি হাসপাতালের কর্মী এবং ১৬ বিদেশি মা রয়েছেন। আরও আছেন ১৭ থাই পুরুষ ও পাঁচজন চীনা জৈবিক বাবা। অভিযোগ অনুযায়ী, থাই পুরুষেরা জৈবিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও শিশুর পিতৃত্ব স্বীকার করতেন। এরপর জন্মনিবন্ধনে শিশুকে থাই নাগরিক হিসেবে দেখানোর পথ তৈরি হতো। ৫৩টি তল্লাশি পরোয়ানার মধ্যে ৩২টি ছিল জিনগত পরীক্ষা করার জন্য। বাকি ২১টি গ্রেপ্তার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। একজন সন্দেহভাজন নিবন্ধিত বাবার জিনগত পরীক্ষায় শিশুটির সঙ্গে জৈবিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে সব অভিযোগ এখনো তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
থাই কর্মকর্তাদের মতে, নাগরিকত্ব পাওয়া শিশু ভবিষ্যতে জমি বা সম্পত্তি ধারণ করতে পারে। ব্যাংক হিসাব খোলা, প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হওয়া অথবা শেয়ার রাখার সুযোগও তৈরি হয়। বিদেশি বাবা-মা তখন সন্তানের নামে সম্পদ স্থানান্তর করতে পারেন। উপর থেকে এসব লেনদেন স্বাভাবিক দেখাতে পারে। এই কারণেই আর্থিক গোয়েন্দারা অর্থের প্রবাহ ও সংশ্লিষ্ট সম্পদ অনুসরণ করবেন। অপরাধের সঙ্গে যোগ পাওয়া গেলে সম্পদ জব্দের ব্যবস্থাও বিবেচিত হবে। ভুয়া পিতৃত্ব নেটওয়ার্কটি অনলাইনে বিদেশি গ্রাহক ও কথিত বাবা জোগাড় করত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন আইন সংশোধন এবং জাল তথ্য দেওয়ার শাস্তি স্পষ্ট করার প্রস্তুতি নিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য ঘটনাটির তাৎপর্য জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতায়। একটি জন্মসনদ পরে জাতীয় পরিচয়, পাসপোর্ট, শিক্ষা, ব্যাংকিং এবং উত্তরাধিকারের ভিত্তি হয়ে ওঠে। শুরুতেই মিথ্যা সম্পর্ক ঢুকলে পরবর্তী প্রতিটি নথি বাহ্যিকভাবে বৈধ দেখাতে পারে। মানব পাচার, পরিচয় বদল বা অবৈধ সম্পদ ধারণেও একই দুর্বলতা কাজে লাগানো সম্ভব। বাংলাদেশেও জন্মনিবন্ধনে স্থানীয় যাচাই, হাসপাতালের তথ্য এবং বাবা-মায়ের উপস্থিতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তবে কঠোরতা যেন প্রকৃত একক মা, প্রবাসী পরিবার বা নথিহীন শিশুকে সেবা থেকে বঞ্চিত না করে। থাইল্যান্ডের ঘটনা দেখায়, ভুয়া পিতৃত্ব নেটওয়ার্ক ঠেকাতে শুধু কাগজ বাড়ানো নয়, তথ্যের মিল ও কর্মকর্তার জবাবদিহি একসঙ্গে দরকার।
থাই প্রশাসন এখন বিদেশি বাবা বা মা থাকলে উভয় অভিভাবকের সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার পথে যাচ্ছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে দালাল, অনলাইন যোগাযোগ এবং অর্থ লেনদেন অনুসরণ করা হবে। ৪০টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বড় সংখ্যা মনে হলেও ৩২টি জিনগত পরীক্ষাই মামলার প্রকৃত বিস্তার বোঝাতে পারে। পরীক্ষায় আরও কত নিবন্ধিত সম্পর্ক ভেঙে পড়ে, তার ওপর আইন পরিবর্তনের গতি নির্ভর করবে। একই সঙ্গে প্রকৃত শিশুদের নাগরিক অবস্থান কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটিও জটিল প্রশ্ন। নেটওয়ার্ক ভাঙার পর থাইল্যান্ডকে তাই অপরাধীর দায় এবং শিশুর অধিকার আলাদা রেখেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















