থাইল্যান্ডে জাতীয়তা বা বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও শিশুদের সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার রয়েছে। দেশটির শিক্ষা নীতি সব শিশুকে ১৫ বছরের বিনা খরচের শিক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। মিয়ানমার থেকে আসা অভিবাসী ও রাষ্ট্রহীন শিশুরাও এর আওতায় পড়ে। ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই অধিকার পুনর্ব্যক্ত করে বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানোর তাগিদ তুলে ধরা হয়েছে। কারণ কাগজে সুযোগ থাকলেও বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো শ্রেণিকক্ষের বাইরে। অভিবাসী শিশুর শিক্ষা নিয়ে থাইল্যান্ডের এই ব্যবধানই নীতিটির বড় পরীক্ষা। ইউনিসেফ থাইল্যান্ড বলছে, কোনো কোনো হিসাবে দেশটির প্রায় অর্ধেক অভিবাসী শিশু কোনো ধরনের শিক্ষা পাচ্ছে না।
এই নীতির ভিত্তি নতুন নয়। ১৯৯৯ সালের সবার জন্য শিক্ষা নীতি এবং ২০০৫ সালের অনিবন্ধিত ব্যক্তিদের শিক্ষা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এর প্রধান ভিত্তি। পরে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহায়তার তহবিলেও অভিবাসী এবং রাষ্ট্রহীন শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শুধু পরিচয়পত্র না থাকার কারণে কোনো শিশুকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা নয়। তবু মাঠপর্যায়ে নিয়ম সম্পর্কে ভুল ধারণা, ভাষার বাধা এবং পরিবারের ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন ভর্তি কমিয়ে দেয়। যাতায়াত, পোশাক ও অতিরিক্ত শেখার খরচও পরিবারের ওপর পড়ে। অভিবাসী শিশুর শিক্ষা তাই বিনা বেতনের ঘোষণা দিয়েই নিশ্চিত হয় না। বিদ্যালয়ে পৌঁছানো এবং টিকে থাকার খরচও বিবেচনা করতে হয়।
থাইল্যান্ডের নির্মাণশিবিরগুলোতে আনুমানিক ৬০ হাজার শিশু বেড়ে উঠছে। অনেকের স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ খেলার জায়গা ও বিদ্যালয়ে প্রবেশ সীমিত। ইউনিসেফ ও সহযোগী সংস্থার উদ্যোগে ২৮টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে। এতে ৯ হাজার ৮০০-এর বেশি কর্মী ও শিশু সহায়তা পেয়েছেন। চিয়াং দাও এলাকার একটি বিদ্যালয়ে এখন পাঁচটি জাতিগোষ্ঠীর ১০৯ শিশু পড়ছে। সেখানে থাই ভাষার পাশাপাশি শিশুদের মাতৃভাষাকে সম্মান করে বহুভাষিক খেলা ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতি উপস্থিতি বাড়ালেও শেখার ব্যবধান রয়ে গেছে। ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী থাই শিশুর ৭১ শতাংশ মৌলিক পাঠদক্ষতা অর্জন করে। অ-থাইভাষী পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে হারটি ৪৩ শতাংশ। অভিবাসী শিশুর শিক্ষা প্রবেশের পর তাই ভাষাভিত্তিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা নিয়ে একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন রয়েছে। জরুরি আশ্রয়ের সময় অস্থায়ী শেখার কেন্দ্র কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বহু বছর অবস্থানের পর ভাষা, স্বীকৃত পাঠক্রম, পরীক্ষার সুযোগ এবং পরবর্তী দক্ষতার পথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয় দরিদ্র শিশুদের সুযোগ কমছে এমন ধারণাও সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে। থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায়, অভিবাসী শিশুর শিক্ষা এবং স্থানীয় বিদ্যালয়ের সক্ষমতা একসঙ্গে বাড়াতে হয়। শুধু শরণার্থী বা অভিবাসী পরিচয় ধরে আলাদা ব্যবস্থা করলে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও সামাজিক যোগাযোগ সীমিত হতে পারে। আবার প্রস্তুতি ছাড়া সরাসরি মূল ধারায় নিলে ভাষার কারণে শিশুরা পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের জন্য কার্যকর পথ হতে পারে পর্যায়ক্রমিক ভাষা সহায়তা, স্বীকৃত শেখার ফল এবং স্থানীয় বিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়ন।
থাইল্যান্ডের ১৫ বছরের নিশ্চয়তা একটি শক্ত আইনি ভিত্তি দিয়েছে। কিন্তু ৭১ ও ৪৩ শতাংশ পাঠদক্ষতার ব্যবধান দেখায়, বিদ্যালয়ের দরজা খোলাই শেষ ফল নয়। সামনে দেখতে হবে, ভর্তি হওয়া শিশুরা কত বছর টিকে থাকে এবং কোন ভাষায় শেখার সক্ষমতা গড়ে তোলে। নির্মাণশিবিরের ৬০ হাজার শিশুর মতো চলমান জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যালয় কীভাবে ধারাবাহিকতা রাখে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নীতিটির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নিবন্ধিত ভর্তির সংখ্যায় নয়, নথিহীন একটি শিশু পড়তে, লিখতে এবং পরবর্তী শ্রেণিতে যেতে পারছে কি না, সেখানে মাপা হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















