০৯:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
মিশরজুড়ে বিশ্বকাপ নায়কদের বীরের সংবর্ধনা, ইতিহাস গড়া দলকে ঘিরে উচ্ছ্বাস আপত্তির মুখে ভারতের নাগরিকত্ব যাচাই অভিযান, দেশে ফিরল সোনালি বিবির পরিবার চ্যাটজিপিটি ওয়ার্ক উন্মোচন, কর্মক্ষেত্রের এআইয়ের দৌড়ে নতুন অধ্যায় দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভে অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি ধ্বংসস্তূপের খার্তুমে ফিরেছে ২০ লাখ মানুষ, সংকট বিদ্যুৎ-পানি ও কর্মসংস্থানে গাজায় বিশ্বকাপ দেখানোর আয়োজন করা ত্রাণকর্মী বিমান হামলায় নিহত স্পেনে ভয়াবহ দাবানল, নিহত ১২ ও নিখোঁজ ২৩ ইউক্রেনকে ৭০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার অঙ্গীকার ন্যাটোর, ক্ষুব্ধ রাশিয়া সিরাজগঞ্জে নিখোঁজের দুই দিন পর মিলল যুবকের মরদেহ, হত্যার আলামত বাগেরহাটে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, বিপাকে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা

আমেরিকার পরিচয় কি ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি খ্রিস্টান? বিভক্তির বাইরে তৃতীয় পথের সন্ধান

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ যত গভীর হচ্ছে, ততই দেশটির পরিচয় নিয়ে বিতর্কও তীব্র হয়ে উঠছে। এক পক্ষ বলছে, আমেরিকা মূলত একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র, তাই রাষ্ট্রের নীতি ও জনজীবনে সেই ঐতিহ্যের প্রভাব আরও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। অন্য পক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রে; রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে হবে।

এই দুই অবস্থানই বাস্তবতাকে সরলীকৃত করে। আমেরিকার ইতিহাস, রাষ্ট্রগঠন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির পরিচয়কে শুধু “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” কিংবা “ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র”—এই দুইয়ের একটিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বতন্ত্র “নাগরিক ধর্ম” বা সিভিল রিলিজিয়ন আমেরিকান জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

এই ধারণাটি কোনো নির্দিষ্ট গির্জা, ধর্মীয় মতবাদ বা উপাসনাপদ্ধতির সঙ্গে একীভূত নয়। আবার এটি এমনও নয় যে রাষ্ট্র ধর্মকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। বরং জাতীয় ইতিহাস, নৈতিক মূল্যবোধ, প্রতীক, স্মৃতি ও ধর্মীয় ভাষার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা ভিন্ন ধর্মের মানুষকেও একই জাতীয় পরিচয়ের ছাতার নিচে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়।

অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে সামনে এনে বলেন, দেশটি জন্ম থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ। সত্যি বলতে, সংবিধানে ফেডারেল পর্যায়ে ধর্মীয় পরীক্ষার বিধান নেই, কোনো জাতীয় ধর্ম প্রতিষ্ঠার সুযোগও রাখা হয়নি। প্রথম সংশোধনী ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে।

কিন্তু এখানেই পুরো ইতিহাস শেষ হয়ে যায় না।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় অধিকাংশ নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের খ্রিস্টান পরিচয়ের মধ্যেই দেখতেন। নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক গঠন এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে তখন আলাদা করে ভাবা হতো না। এমনকি সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরও অনেক অঙ্গরাজ্যে উপনিবেশিক আমলের ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্রের পক্ষপাত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের শুরুটা পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ ছিল—এমন দাবি যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি এটাও সত্য নয় যে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

Christian Nationalism: an explainer - Theos Think Tank - Understanding  faith. Enriching society.

বাস্তবে, জাতীয় পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” হিসেবে ঘোষণার একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো সফল হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যও নির্দিষ্ট গির্জা বা ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পক্ষপাত দূর করেছে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। রাষ্ট্র ও ধর্মের আনুষ্ঠানিক দূরত্ব বাড়লেও ধর্মের সামাজিক প্রভাব কমে যায়নি। বরং ধর্মীয় ভাষা, নৈতিক আহ্বান এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস আমেরিকার রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রপতির শপথের শেষে “So help me God” উচ্চারণ, জাতীয় প্রার্থনার আহ্বান কিংবা “In God We Trust”—এসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এগুলো জাতীয় পরিচয়ের অংশে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বেলাহ প্রায় ছয় দশক আগে “আমেরিকান সিভিল রিলিজিয়ন” ধারণাটি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এটি এমন এক বিশ্বাসব্যবস্থা, যা প্রচলিত অর্থে খ্রিস্টধর্ম নয়, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও নয়। এটি চার্চের বাইরে গড়ে ওঠা এমন একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য, যা জাতিকে একত্রে বেঁধে রাখে।

এই নাগরিক ধর্মের উৎসও একমাত্র বাইবেল নয়। স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সংবিধান রচনার ভাষায় যেমন হিব্রু বাইবেলের প্রভাব স্পষ্ট, তেমনি প্রাচীন গ্রিক ও রোমান প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক আদর্শও এর মধ্যে গভীরভাবে উপস্থিত। ফলে এটি একক কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্প্রসারণ নয়; বরং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ধারার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জাতীয় কল্পনা।

এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি নাগরিকরা সহজেই নিজেদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখতে পেরেছেন। একই সঙ্গে এটি এমন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছে, যা খ্রিস্টান এবং অ-খ্রিস্টান—উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

সমালোচকেরা অবশ্য বলেন, এত বিচিত্র উৎসের সমন্বয়ে তৈরি এই নাগরিক ধর্মের গভীরতা নেই। কিন্তু আমেরিকার ইতিহাস অন্য কথা বলে।

আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ কিংবা তাঁর দ্বিতীয় অভিষেক ভাষণ জাতীয় আত্মত্যাগ, নৈতিক দায়িত্ব এবং পুনর্জাগরণ নিয়ে বিশ্বের অন্যতম গভীর রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। জর্জ ওয়াশিংটন জাতির প্রতিষ্ঠাতা পিতার প্রতীক হয়ে ওঠেন, আর লিংকন জাতীয় আত্মত্যাগের প্রতিমূর্তি। পরে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র খ্রিস্টীয় নৈতিক ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যা বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী—দুই পক্ষকেই সমানভাবে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়।

Christianity and American Identity - The Dispatch

আজও লিংকন মেমোরিয়াল, আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রি কিংবা অন্যান্য জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়; এগুলো জাতীয় স্মৃতি, মূল্যবোধ এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

অবশ্য এই নাগরিক ধর্ম কোনো অলৌকিক সমাধান নয়। একই প্রতীক ও একই ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে তীব্র বিরোধ হতে পারে, এবং হয়ও। তাছাড়া এই ঐতিহ্যের বৌদ্ধিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি যদি নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে যায়, তাহলে এর স্থায়িত্বও প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এই কারণেই শিক্ষা ব্যবস্থায় বাইবেল, ধ্রুপদি রাজনৈতিক চিন্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাসকে নতুন গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। উদ্দেশ্য ধর্মান্তর নয়; বরং নাগরিকদের সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, যার ওপর একটি বহুধর্মী গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে।

বর্তমান আমেরিকার বাস্তবতা হলো, দেশটির খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে যাবে না। একইভাবে অ-খ্রিস্টান নাগরিক কিংবা খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদে অস্বস্তি বোধ করা বিপুল সংখ্যক মানুষও হারিয়ে যাবে না। তাই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি যদি কোনো একক ধর্মীয় মতবাদ বা সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ বিমূর্ততার ওপর দাঁড় করানো হয়, তাহলে বিভাজন আরও বাড়তে পারে।

বরং এমন একটি নাগরিক বিশ্বাসব্যবস্থা, যা ধর্মীয় ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করেও রাষ্ট্রকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অধীনস্থ করে না, সেটিই আমেরিকার মতো বহুমাত্রিক সমাজের জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে। ইতিহাসও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। বিভক্ত এক জাতিকে এক সুতোয় বাঁধতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন একটি অভিন্ন নৈতিক কাহিনি, যেখানে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষও নিজেদের সমান অংশীদার বলে অনুভব করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মিশরজুড়ে বিশ্বকাপ নায়কদের বীরের সংবর্ধনা, ইতিহাস গড়া দলকে ঘিরে উচ্ছ্বাস

আমেরিকার পরিচয় কি ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি খ্রিস্টান? বিভক্তির বাইরে তৃতীয় পথের সন্ধান

০৮:০৮:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মেরুকরণ যত গভীর হচ্ছে, ততই দেশটির পরিচয় নিয়ে বিতর্কও তীব্র হয়ে উঠছে। এক পক্ষ বলছে, আমেরিকা মূলত একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র, তাই রাষ্ট্রের নীতি ও জনজীবনে সেই ঐতিহ্যের প্রভাব আরও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। অন্য পক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রে; রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে হবে।

এই দুই অবস্থানই বাস্তবতাকে সরলীকৃত করে। আমেরিকার ইতিহাস, রাষ্ট্রগঠন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির পরিচয়কে শুধু “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” কিংবা “ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র”—এই দুইয়ের একটিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বতন্ত্র “নাগরিক ধর্ম” বা সিভিল রিলিজিয়ন আমেরিকান জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

এই ধারণাটি কোনো নির্দিষ্ট গির্জা, ধর্মীয় মতবাদ বা উপাসনাপদ্ধতির সঙ্গে একীভূত নয়। আবার এটি এমনও নয় যে রাষ্ট্র ধর্মকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। বরং জাতীয় ইতিহাস, নৈতিক মূল্যবোধ, প্রতীক, স্মৃতি ও ধর্মীয় ভাষার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা ভিন্ন ধর্মের মানুষকেও একই জাতীয় পরিচয়ের ছাতার নিচে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়।

অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে সামনে এনে বলেন, দেশটি জন্ম থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ। সত্যি বলতে, সংবিধানে ফেডারেল পর্যায়ে ধর্মীয় পরীক্ষার বিধান নেই, কোনো জাতীয় ধর্ম প্রতিষ্ঠার সুযোগও রাখা হয়নি। প্রথম সংশোধনী ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে।

কিন্তু এখানেই পুরো ইতিহাস শেষ হয়ে যায় না।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় অধিকাংশ নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের খ্রিস্টান পরিচয়ের মধ্যেই দেখতেন। নৈতিক শিক্ষা, নাগরিক গঠন এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে তখন আলাদা করে ভাবা হতো না। এমনকি সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরও অনেক অঙ্গরাজ্যে উপনিবেশিক আমলের ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্রের পক্ষপাত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের শুরুটা পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ ছিল—এমন দাবি যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি এটাও সত্য নয় যে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

Christian Nationalism: an explainer - Theos Think Tank - Understanding  faith. Enriching society.

বাস্তবে, জাতীয় পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” হিসেবে ঘোষণার একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো সফল হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যও নির্দিষ্ট গির্জা বা ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পক্ষপাত দূর করেছে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। রাষ্ট্র ও ধর্মের আনুষ্ঠানিক দূরত্ব বাড়লেও ধর্মের সামাজিক প্রভাব কমে যায়নি। বরং ধর্মীয় ভাষা, নৈতিক আহ্বান এবং ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস আমেরিকার রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রপতির শপথের শেষে “So help me God” উচ্চারণ, জাতীয় প্রার্থনার আহ্বান কিংবা “In God We Trust”—এসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এগুলো জাতীয় পরিচয়ের অংশে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বেলাহ প্রায় ছয় দশক আগে “আমেরিকান সিভিল রিলিজিয়ন” ধারণাটি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এটি এমন এক বিশ্বাসব্যবস্থা, যা প্রচলিত অর্থে খ্রিস্টধর্ম নয়, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও নয়। এটি চার্চের বাইরে গড়ে ওঠা এমন একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য, যা জাতিকে একত্রে বেঁধে রাখে।

এই নাগরিক ধর্মের উৎসও একমাত্র বাইবেল নয়। স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সংবিধান রচনার ভাষায় যেমন হিব্রু বাইবেলের প্রভাব স্পষ্ট, তেমনি প্রাচীন গ্রিক ও রোমান প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক আদর্শও এর মধ্যে গভীরভাবে উপস্থিত। ফলে এটি একক কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্প্রসারণ নয়; বরং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ধারার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জাতীয় কল্পনা।

এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি নাগরিকরা সহজেই নিজেদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখতে পেরেছেন। একই সঙ্গে এটি এমন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছে, যা খ্রিস্টান এবং অ-খ্রিস্টান—উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

সমালোচকেরা অবশ্য বলেন, এত বিচিত্র উৎসের সমন্বয়ে তৈরি এই নাগরিক ধর্মের গভীরতা নেই। কিন্তু আমেরিকার ইতিহাস অন্য কথা বলে।

আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ কিংবা তাঁর দ্বিতীয় অভিষেক ভাষণ জাতীয় আত্মত্যাগ, নৈতিক দায়িত্ব এবং পুনর্জাগরণ নিয়ে বিশ্বের অন্যতম গভীর রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। জর্জ ওয়াশিংটন জাতির প্রতিষ্ঠাতা পিতার প্রতীক হয়ে ওঠেন, আর লিংকন জাতীয় আত্মত্যাগের প্রতিমূর্তি। পরে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র খ্রিস্টীয় নৈতিক ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যা বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী—দুই পক্ষকেই সমানভাবে অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়।

Christianity and American Identity - The Dispatch

আজও লিংকন মেমোরিয়াল, আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রি কিংবা অন্যান্য জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়; এগুলো জাতীয় স্মৃতি, মূল্যবোধ এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

অবশ্য এই নাগরিক ধর্ম কোনো অলৌকিক সমাধান নয়। একই প্রতীক ও একই ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে তীব্র বিরোধ হতে পারে, এবং হয়ও। তাছাড়া এই ঐতিহ্যের বৌদ্ধিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি যদি নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে যায়, তাহলে এর স্থায়িত্বও প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এই কারণেই শিক্ষা ব্যবস্থায় বাইবেল, ধ্রুপদি রাজনৈতিক চিন্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাসকে নতুন গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। উদ্দেশ্য ধর্মান্তর নয়; বরং নাগরিকদের সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, যার ওপর একটি বহুধর্মী গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে।

বর্তমান আমেরিকার বাস্তবতা হলো, দেশটির খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে যাবে না। একইভাবে অ-খ্রিস্টান নাগরিক কিংবা খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদে অস্বস্তি বোধ করা বিপুল সংখ্যক মানুষও হারিয়ে যাবে না। তাই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি যদি কোনো একক ধর্মীয় মতবাদ বা সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ বিমূর্ততার ওপর দাঁড় করানো হয়, তাহলে বিভাজন আরও বাড়তে পারে।

বরং এমন একটি নাগরিক বিশ্বাসব্যবস্থা, যা ধর্মীয় ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করেও রাষ্ট্রকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অধীনস্থ করে না, সেটিই আমেরিকার মতো বহুমাত্রিক সমাজের জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে। ইতিহাসও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। বিভক্ত এক জাতিকে এক সুতোয় বাঁধতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন একটি অভিন্ন নৈতিক কাহিনি, যেখানে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষও নিজেদের সমান অংশীদার বলে অনুভব করতে পারে।