০৮:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
নীরব মহামারি: কেন এখনই ফ্যাটি লিভার রোগকে জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখতে হবে মিশরজুড়ে বিশ্বকাপ নায়কদের বীরের সংবর্ধনা, ইতিহাস গড়া দলকে ঘিরে উচ্ছ্বাস আপত্তির মুখে ভারতের নাগরিকত্ব যাচাই অভিযান, দেশে ফিরল সোনালি বিবির পরিবার চ্যাটজিপিটি ওয়ার্ক উন্মোচন, কর্মক্ষেত্রের এআইয়ের দৌড়ে নতুন অধ্যায় দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভে অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি ধ্বংসস্তূপের খার্তুমে ফিরেছে ২০ লাখ মানুষ, সংকট বিদ্যুৎ-পানি ও কর্মসংস্থানে গাজায় বিশ্বকাপ দেখানোর আয়োজন করা ত্রাণকর্মী বিমান হামলায় নিহত স্পেনে ভয়াবহ দাবানল, নিহত ১২ ও নিখোঁজ ২৩ ইউক্রেনকে ৭০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার অঙ্গীকার ন্যাটোর, ক্ষুব্ধ রাশিয়া সিরাজগঞ্জে নিখোঁজের দুই দিন পর মিলল যুবকের মরদেহ, হত্যার আলামত

নীরব মহামারি: কেন এখনই ফ্যাটি লিভার রোগকে জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখতে হবে

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, যিনি বহু বছর ধরে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পক্ষের মানুষ। মদ্যপান করেন না, নিরামিষভোজী, নিয়মিত জীবনযাপন করেন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে রক্ত পরীক্ষা করাতে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন, তার লিভারের এনজাইমের মাত্রা অস্বাভাবিক। বিস্মিত হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী লিভারের সমস্যা মানেই যেন মদ্যপানের ইতিহাস। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। তার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ—দুটি বিপাকীয় সমস্যা—ছিল, আর সেখানেই লুকিয়ে ছিল আসল কারণ।

এই ঘটনাটি কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে বিপাকীয় অকার্যকারিতাজনিত স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD), যা দীর্ঘদিন ‘ফ্যাটি লিভার’ নামে পরিচিত ছিল, দ্রুত জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। রোগটির নতুন নামই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—এটি মূলত অ্যালকোহল নয়, বরং শরীরের বিপাকীয় অসামঞ্জস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ভারতের মতো দেশে এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণার সম্মিলিত হিসাব বলছে, দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৮ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন। অর্থাৎ সংখ্যাটি ১০ কোটিরও বেশি। একই সময়ে ডায়াবেটিসের প্রকোপও দ্রুত বাড়ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হয় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, নয়তো প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় রয়েছেন। এই দুই সংকট একে অন্যকে আরও জটিল করে তুলছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগটি সাধারণত নীরবে অগ্রসর হয়। অধিকাংশ রোগীর কোনো ব্যথা হয় না, দৃশ্যমান লক্ষণও থাকে না। অনেক সময় সাধারণ রক্ত পরীক্ষায়ও বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে না। ফলে মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করলেও লিভারের ভেতরে ধীরে ধীরে চর্বি জমা হয়, প্রদাহ তৈরি হয় এবং একসময় দাগ বা ফাইব্রোসিস গড়ে ওঠে।

এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে পারে। পরে তা আরও গুরুতর প্রদাহজনিত অবস্থায় রূপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সিরোসিস, লিভার বিকল হওয়া কিংবা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আজ যাদের বয়স চল্লিশ বা পঞ্চাশের কাছাকাছি, তাদের একটি অংশ আগামী দুই বা তিন দশকে জটিল লিভার রোগ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পারেন। অর্থাৎ আমরা এমন একটি স্বাস্থ্য সংকটের দিকে এগোচ্ছি, যার প্রকৃত প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।

সমস্যা হলো, রোগ শনাক্ত করার প্রচলিত পদ্ধতিও সবসময় যথেষ্ট নয়। সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে স্পষ্ট চর্বি জমা ধরা পড়লেও প্রাথমিক পর্যায় বা লিভারের ক্ষতির মাত্রা নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না। বর্তমানে ফাইব্রোস্ক্যানের মতো আধুনিক, দ্রুত ও ব্যথাহীন প্রযুক্তি লিভারের শক্ত হওয়া এবং চর্বির পরিমাণ মূল্যায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এমআরআই-ভিত্তিক উন্নত পরীক্ষাও অনেক ক্ষেত্রে নির্ভুল তথ্য দিতে পারে। ফলে রোগ শনাক্তের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

Fatty Liver Disease: A Silent Killer | Symptoms & Causes

তবে এই গল্পের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভার এমন একটি অবস্থা, যা সময়মতো ব্যবস্থা নিলে উল্টে দেওয়া সম্ভব। এর জন্য কোনো অলৌকিক ওষুধের প্রয়োজন হয় না। বরং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, কোলেস্টেরল কমানো এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমানো গেলে লিভারের চর্বি ও প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। আরও বেশি ওজন কমাতে পারলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষতও আংশিকভাবে সেরে উঠতে শুরু করে।

এ কারণেই প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, পরবর্তী জীবনের অনেক বিপাকীয় রোগের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশব, কৈশোর ও তরুণ বয়সেই। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত ওজন ভবিষ্যতের লিভার রোগের পথ তৈরি করে দেয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এমএএসএইচের নির্দিষ্ট পর্যায়ের রোগীদের জন্য নতুন ওষুধ অনুমোদন পেয়েছে। সেমাগ্লুটাইডও এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং এটি ইতোমধ্যে ভারতে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি রেসমেটিরোমও ধীরে ধীরে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। তবে এসব ওষুধ জীবনযাপনের পরিবর্তনের বিকল্প নয়; বরং রোগটি যত দ্রুত ধরা পড়বে, তত বেশি কার্যকরভাবে এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

যাদের লিভারে গুরুতর দাগ বা সিরোসিস রয়েছে, তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। যদিও সাধারণ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোত্তম স্ক্রিনিং কৌশল নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে, তবু সেই অনিশ্চয়তাকে নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

এখন প্রয়োজন জনস্বাস্থ্যভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ। স্থূলতা প্রতিরোধে ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তা নিশ্চিত করতে হবে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা কিংবা উচ্চ কোলেস্টেরলে আক্রান্ত প্রত্যেক মানুষের নিয়মিত লিভার পরীক্ষা স্বাস্থ্যসেবার অংশ হওয়া উচিত। আধুনিক নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে হবে। যাদের লিভারে অগ্রসর ক্ষতি রয়েছে, তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। একই সঙ্গে রোগকে জটিল পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

একজন রোগীর অস্বাভাবিক রক্ত পরীক্ষার ফল যেমন তার জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে, তেমনি একটি দেশের জন্যও বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট সংকেত। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বিপদ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। কিন্তু দেরি করলে আজকের নীরব সংকট আগামী কয়েক দশকে এক বিশাল স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

ফ্যাটি লিভারকে কেবল একটি অঙ্গের রোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ডায়াবেটিস, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, নগরজীবন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য নীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এই নীরব মহামারিকে গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি এড়ানোর একমাত্র বাস্তব পথ।

জনপ্রিয় সংবাদ

নীরব মহামারি: কেন এখনই ফ্যাটি লিভার রোগকে জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখতে হবে

নীরব মহামারি: কেন এখনই ফ্যাটি লিভার রোগকে জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখতে হবে

০৮:০০:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, যিনি বহু বছর ধরে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পক্ষের মানুষ। মদ্যপান করেন না, নিরামিষভোজী, নিয়মিত জীবনযাপন করেন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে রক্ত পরীক্ষা করাতে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন, তার লিভারের এনজাইমের মাত্রা অস্বাভাবিক। বিস্মিত হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী লিভারের সমস্যা মানেই যেন মদ্যপানের ইতিহাস। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। তার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ—দুটি বিপাকীয় সমস্যা—ছিল, আর সেখানেই লুকিয়ে ছিল আসল কারণ।

এই ঘটনাটি কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে বিপাকীয় অকার্যকারিতাজনিত স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD), যা দীর্ঘদিন ‘ফ্যাটি লিভার’ নামে পরিচিত ছিল, দ্রুত জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। রোগটির নতুন নামই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—এটি মূলত অ্যালকোহল নয়, বরং শরীরের বিপাকীয় অসামঞ্জস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ভারতের মতো দেশে এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণার সম্মিলিত হিসাব বলছে, দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৮ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন। অর্থাৎ সংখ্যাটি ১০ কোটিরও বেশি। একই সময়ে ডায়াবেটিসের প্রকোপও দ্রুত বাড়ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হয় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, নয়তো প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় রয়েছেন। এই দুই সংকট একে অন্যকে আরও জটিল করে তুলছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগটি সাধারণত নীরবে অগ্রসর হয়। অধিকাংশ রোগীর কোনো ব্যথা হয় না, দৃশ্যমান লক্ষণও থাকে না। অনেক সময় সাধারণ রক্ত পরীক্ষায়ও বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে না। ফলে মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করলেও লিভারের ভেতরে ধীরে ধীরে চর্বি জমা হয়, প্রদাহ তৈরি হয় এবং একসময় দাগ বা ফাইব্রোসিস গড়ে ওঠে।

এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে পারে। পরে তা আরও গুরুতর প্রদাহজনিত অবস্থায় রূপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সিরোসিস, লিভার বিকল হওয়া কিংবা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আজ যাদের বয়স চল্লিশ বা পঞ্চাশের কাছাকাছি, তাদের একটি অংশ আগামী দুই বা তিন দশকে জটিল লিভার রোগ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পারেন। অর্থাৎ আমরা এমন একটি স্বাস্থ্য সংকটের দিকে এগোচ্ছি, যার প্রকৃত প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।

সমস্যা হলো, রোগ শনাক্ত করার প্রচলিত পদ্ধতিও সবসময় যথেষ্ট নয়। সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে স্পষ্ট চর্বি জমা ধরা পড়লেও প্রাথমিক পর্যায় বা লিভারের ক্ষতির মাত্রা নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না। বর্তমানে ফাইব্রোস্ক্যানের মতো আধুনিক, দ্রুত ও ব্যথাহীন প্রযুক্তি লিভারের শক্ত হওয়া এবং চর্বির পরিমাণ মূল্যায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এমআরআই-ভিত্তিক উন্নত পরীক্ষাও অনেক ক্ষেত্রে নির্ভুল তথ্য দিতে পারে। ফলে রোগ শনাক্তের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

Fatty Liver Disease: A Silent Killer | Symptoms & Causes

তবে এই গল্পের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভার এমন একটি অবস্থা, যা সময়মতো ব্যবস্থা নিলে উল্টে দেওয়া সম্ভব। এর জন্য কোনো অলৌকিক ওষুধের প্রয়োজন হয় না। বরং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, কোলেস্টেরল কমানো এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমানো গেলে লিভারের চর্বি ও প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। আরও বেশি ওজন কমাতে পারলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষতও আংশিকভাবে সেরে উঠতে শুরু করে।

এ কারণেই প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, পরবর্তী জীবনের অনেক বিপাকীয় রোগের ভিত্তি তৈরি হয় শৈশব, কৈশোর ও তরুণ বয়সেই। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত ওজন ভবিষ্যতের লিভার রোগের পথ তৈরি করে দেয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এমএএসএইচের নির্দিষ্ট পর্যায়ের রোগীদের জন্য নতুন ওষুধ অনুমোদন পেয়েছে। সেমাগ্লুটাইডও এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং এটি ইতোমধ্যে ভারতে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি রেসমেটিরোমও ধীরে ধীরে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। তবে এসব ওষুধ জীবনযাপনের পরিবর্তনের বিকল্প নয়; বরং রোগটি যত দ্রুত ধরা পড়বে, তত বেশি কার্যকরভাবে এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

যাদের লিভারে গুরুতর দাগ বা সিরোসিস রয়েছে, তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। যদিও সাধারণ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বোত্তম স্ক্রিনিং কৌশল নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে, তবু সেই অনিশ্চয়তাকে নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

এখন প্রয়োজন জনস্বাস্থ্যভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ। স্থূলতা প্রতিরোধে ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তা নিশ্চিত করতে হবে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা কিংবা উচ্চ কোলেস্টেরলে আক্রান্ত প্রত্যেক মানুষের নিয়মিত লিভার পরীক্ষা স্বাস্থ্যসেবার অংশ হওয়া উচিত। আধুনিক নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে হবে। যাদের লিভারে অগ্রসর ক্ষতি রয়েছে, তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। একই সঙ্গে রোগকে জটিল পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

একজন রোগীর অস্বাভাবিক রক্ত পরীক্ষার ফল যেমন তার জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে, তেমনি একটি দেশের জন্যও বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট সংকেত। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বিপদ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। কিন্তু দেরি করলে আজকের নীরব সংকট আগামী কয়েক দশকে এক বিশাল স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

ফ্যাটি লিভারকে কেবল একটি অঙ্গের রোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ডায়াবেটিস, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, নগরজীবন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য নীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এই নীরব মহামারিকে গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি এড়ানোর একমাত্র বাস্তব পথ।