বিশ্বের সবচেয়ে বড় আম উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চাপে পড়েছে ভারত। কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় ভারত থেকে তাজা আম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জাপান। এই ঘটনা শুধু আম রপ্তানির ক্ষেত্রেই নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ভারতীয় মসলা, সামুদ্রিক খাদ্য, চালসহ নানা কৃষিপণ্যের ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষা, সতর্কতা এবং আমদানি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় খাদ্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
খামার থেকেই শুরু সমস্যার শিকড়
খাদ্যনিরাপত্তার সংকটের মূল কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার, নিষিদ্ধ রাসায়নিকের প্রয়োগ এবং দুর্বল বালাই ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তদারকির ঘাটতি ও অনিয়ম। ফলে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ওষুধের রাসায়নিক এবং ক্ষতিকর জীবাণু উৎপাদন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যে থেকে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্যকে আরও কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে এবং অনেক চালান প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিরও মুখে পড়তে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে দেশের ভোক্তারাই
সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ভারতের সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খাদ্যনমুনা মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এক অভিযানে গুজরাটে পচা, ছত্রাক আক্রান্ত ও কীটধরা আমের মজুতও উদ্ধার করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল।
এ ছাড়া দ্রুত পাকানোর জন্য নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এসব রাসায়নিক তাৎক্ষণিকভাবে গুরুতর শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রপ্তানিতে বাড়ছে চাপ
আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যনিরাপত্তার মান পূরণ না করতে পারলে শুধু একটি চালানই নয়, পুরো দেশের রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো চালান ফেরত এলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর আরও কঠোর নজরদারি ও অতিরিক্ত পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এতে রপ্তানির খরচ বাড়ে এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
সমাধানে কী করা দরকার
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে রপ্তানিবন্দর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের নির্ভরযোগ্য নজরদারি ও অনুসরণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষাগারের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত এক দশকে হলুদের রং উজ্জ্বল করতে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রায় পুরোপুরি নির্মূলে বাংলাদেশ জনসচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবেশী দেশের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ভারতের আমে নিষেধাজ্ঞা ও খাদ্যনিরাপত্তা সংকট নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। কঠোর নজরদারি ও কার্যকর সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















