দীর্ঘদিন ধরে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করে আসছেন, এশিয়ার মতো একদিন আফ্রিকাতেও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। কিন্তু সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, সেই পথ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। কৃষি উৎপাদন বাড়লেও জমিপ্রতি উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়ায় আফ্রিকার উন্নয়নের গতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
জমি বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা নয়
স্বাধীনতার পর থেকে সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোতে ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন শস্যের মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে নতুন জমি চাষের আওতায় আনার মাধ্যমে। কিন্তু আবাদযোগ্য জমি সীমিত হওয়ায় এই ধারা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব নয়।
একই সময়ে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমেই কমে এসেছে এবং এখন তা বিশ্বের গড়ের কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছে।

জমিপ্রতি ফলন বাড়ছে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় হলো জমিপ্রতি উৎপাদন বাড়ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শস্যের ফলন কার্যত স্থির রয়েছে। কৃষিতে ব্যবহৃত শ্রম, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ কতটা দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনে রূপান্তরিত হচ্ছে, সেই সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও অনেক দেশে এক দশক আগের তুলনায় কমে গেছে।
ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক এলাকায় ফলন ও উৎপাদনশীলতা ধারাবাহিকভাবে কমছে। এতে কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কেন কমছে উৎপাদনশীলতা?
এই স্থবিরতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সংঘাত, মাটির উর্বরতা হ্রাস, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বড় ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনেক কৃষক বলছেন, আগের মতো বৃষ্টির সময় আর নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে কখন বীজ বপন করতে হবে, তা নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও গবেষকেরা এখনো জলবায়ুকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেননি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হলো, কৃষিশ্রমিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের একটি বড় অংশ কৃষিকাজে আগের তুলনায় কম সময় দিচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষিত ও তুলনামূলক সচ্ছল কৃষকেরা বিকল্প আয়ের উৎসের দিকে ঝুঁকছেন। এতে মাঠে শ্রমের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতাও হ্রাস পাচ্ছে।
এশিয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বড় পার্থক্য
এশিয়ার সবুজ বিপ্লবের সময় জনসংখ্যা বাড়লেও কৃষকেরা একই জমিতে আরও বেশি উৎপাদনের জন্য সার, উন্নত বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন। সেই উৎপাদন বৃদ্ধি শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি করে এবং গ্রাম থেকে শহরে শ্রমশক্তির স্থানান্তরকে ত্বরান্বিত করে।

কিন্তু আফ্রিকার চিত্র ভিন্ন। শহরের কাছাকাছি এলাকাতেই অনেক কৃষক কৃষিকাজে সময় কমিয়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন। কারণ শহরের খাদ্যচাহিদার একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হওয়ায় স্থানীয় খাদ্যের দাম সব সময় বাড়ছে না। ফলে বেশি উৎপাদনের জন্য কৃষকদের আর্থিক প্রণোদনাও তুলনামূলক কম।
খামারের আকারও বড় প্রশ্ন
খামারের আকার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট খামারে জমিপ্রতি উৎপাদন বেশি হলেও সেগুলো এতটাই ছোট যে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনকভাবে টিকে থাকা কঠিন। আবার তুলনামূলক বড় খামারে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার সহজ হওয়ায় নির্দিষ্ট আকারের পর উৎপাদন আবার বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের জন্য টেকসই আয়ের সুযোগ তৈরির ওপর। তা না হলে এশিয়ার মতো কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















