কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্প এখন বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত ও লাভজনক খাতগুলোর একটি। এই প্রতিযোগিতায় চীন দ্রুত এগিয়ে গেলেও এখনো উৎপাদন প্রযুক্তির বড় সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। চিপ নকশায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য এলেও অত্যাধুনিক চিপ তৈরির ক্ষেত্রে দেশটি এখনো আন্তর্জাতিক শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এই শিল্পের অগ্রগতি শুধু প্রযুক্তি নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতির শক্তির ভারসাম্যও নির্ধারণ করবে।
উদ্ভাবনে বাড়ছে গতি
সম্প্রতি চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক নতুন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে একটি নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরোনো উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করেও উন্নত কর্মক্ষমতার চিপ তৈরির প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
এই আস্থার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও। গত এক বছরে হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের চিপ নকশা ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করছে এবং নতুন কোম্পানিগুলোও বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

চিপ নকশায় শক্ত অবস্থান
কয়েক বছর আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ উন্নত চিপ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করত চীন। কিন্তু রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞার পর দেশটি দ্রুত নিজস্ব বিকল্প গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়।
সরকারি নীতির কারণে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয়ভাবে তৈরি চিপ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর ফলে নতুন চিপ ডিজাইন কোম্পানিগুলো দ্রুত বড় হয়েছে এবং দেশীয় বাজারে তাদের অংশীদারিত্বও বেড়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট চিপের বাজারের বড় অংশই দেশীয় ডিজাইনারদের হাতে থাকবে।
বৃহৎ বাজার দিচ্ছে বাড়তি শক্তি
চীনের অন্যতম বড় সুবিধা তার বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। দেশটির শীর্ষ ক্লাউড সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী তিন বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণেও বড় অঙ্কের সরকারি ব্যয়ের প্রস্তুতি রয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষ প্রকৌশলী ও গবেষকের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বহু চীনা প্রকৌশলী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন দেশীয় শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছেন। ফলে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও দক্ষ জনবল পাওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠেছে।
নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে নতুন পথ
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বিকল্প কৌশল গ্রহণ করছে। একাধিক প্রসেসর একসঙ্গে যুক্ত করে উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের সমন্বয় বাড়িয়ে কম শক্তিশালী চিপ থেকেও ভালো ফল পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
নিজস্ব সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও জোরদার হয়েছে। ফলে সফটওয়্যার ব্যবধান আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদনেই সবচেয়ে বড় বাধা
চিপ ডিজাইনে দ্রুত অগ্রগতি হলেও উৎপাদন পর্যায়ে চীন এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ তৈরিতে যে অত্যাধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি দরকার, তা এখনো দেশটির নাগালের বাইরে।
বিশেষ করে অত্যন্ত ক্ষুদ্র সার্কিট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি চীনের হাতে নেই। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক চিপের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা এখনো কঠিন হয়ে রয়েছে।
এ ছাড়া উন্নত মেমোরি চিপের ঘাটতিও বড় সমস্যা। এই ধরনের মেমোরি এখনো অল্প কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় চীনের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ নয়।
বিকল্প প্রযুক্তিতে এগোনোর চেষ্টা
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে চীন পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করেই উন্নত ফল পাওয়ার নানা পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে একাধিক চিপ একত্রে সংযুক্ত করে উচ্চক্ষমতার ব্যবস্থা তৈরির প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে।
চিপ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আমদানিও গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি দেশীয় যন্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানের বিকল্প প্রযুক্তি তৈরি করছে। উন্নত মেমোরি চিপ উৎপাদনেও ভবিষ্যতে চীনের অংশীদারিত্ব বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথ এখনো দীর্ঘ
বিশ্লেষকদের মতে, চীন নিঃসন্দেহে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে দ্রুত এগোচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তবে বিশ্বের প্রযুক্তিগত শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছাতে হলে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে অত্যাধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ঘাটতি।
তবু বর্তমান অগ্রগতি দেখিয়ে দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে চীন এই ব্যবধান কমাতে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক চিপ শিল্পের প্রতিযোগিতা আগামী বছরগুলোতে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















