যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বসন্তে হওয়া একটি সমঝোতা কার্যকর না হওয়ার পর দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছে। এর জেরে প্রতিদিনই হামলা, পাল্টা হামলা এবং কঠোর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ
সংঘাতের অন্যতম বড় কারণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বে তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে চলাচলের নিয়ম নির্ধারণের অধিকার নিয়ে দুই দেশের অবস্থান একেবারেই বিপরীত। ইরান বলছে, তাদের নির্ধারিত নিয়ম মেনেই জাহাজ চলাচল করতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়ে আসছে।
জুলাইয়ের শুরুতে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনার পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়। ইরান অভিযোগ অস্বীকার করলেও জানায়, নির্ধারিত নির্দেশনা অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে সংঘাত
যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি করে।
দুই পক্ষই নিজেদের পদক্ষেপকে আত্মরক্ষামূলক বলে দাবি করছে। তবে প্রতিদিনের সামরিক অভিযানে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কূটনীতির বদলে কঠোর অবস্থান
ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষই এখন কঠোর ভাষায় একে অপরকে সতর্ক করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, হামলা অব্যাহত থাকলে তারও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, একতরফা কোনো চুক্তি তারা আর মেনে নেবেন না। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কথাও জানিয়েছে দেশটি।
প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক চাপ

চলমান সংঘাতে উভয় পক্ষেই হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার কারণে ক্ষয়ক্ষতিও বেড়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে এবং নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সামনে কী হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই সহজে পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। এতে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে বড় পরিসরের যুদ্ধের ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হলে উত্তেজনা কমার সুযোগ এখনও রয়েছে। অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট আরও বিস্তৃত হয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















