যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের সংবাদদাতা সমিতির নৈশভোজে সাংবাদিকদের একদিকে প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে তীব্র কটাক্ষও করেছেন। গুলির ঘটনায় কয়েক মাস আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই আয়োজন আবারও অনুষ্ঠিত হলো কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে। অনুষ্ঠানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিতর্কের গুরুত্বও উঠে আসে।
ওয়াশিংটনে আয়োজিত এবারের নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরা। এমন অনেক সংবাদকর্মীও সেখানে ছিলেন, যাদের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে। এমনকি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তিনি অতীতে মামলা ও কঠোর সমালোচনাও করেছেন।
সহিংসতার কাছে হার মানবে না সংবাদমাধ্যম
নৈশভোজের শুরুতেই অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা স্পষ্ট করে দেন, কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনা তাদের থামিয়ে দিতে পারেনি। সংবাদদাতা সমিতির বিদায়ী সভাপতি উইজিয়া জিয়াং বলেন, কোনো সহিংস ঘটনার হাতে এমন আয়োজনের শেষ পরিণতি হতে দেওয়া হবে না।

তিনি জানান, আগামী বছরও এই নৈশভোজ একই স্থানে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ ভয় বা সহিংসতার কারণে সংবাদমাধ্যমের এমন ঐতিহ্যবাহী আয়োজন বন্ধ হয়ে যাবে না—এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে অনুষ্ঠানে।
সাংবাদিকদের প্রশংসা, সঙ্গে তীব্র আক্রমণ
ট্রাম্পের বক্তব্যে ছিল দুই ধরনের সুর। কখনো তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে হাস্যরস করেছেন, তাদের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, অধিকাংশ সাংবাদিককেই তিনি সম্মান করেন। আবার কিছু সময় পরই তিনি উপস্থিত সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে কড়া মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের মধ্যে ‘ট্রাম্প-বিরোধী মানসিকতা’ রয়েছে বলে কটাক্ষ করেন। তিনি রসিকতা করে বলেন, অনুষ্ঠানস্থলে একসঙ্গে এত বেশি মানুষকে তিনি আগে দেখেননি, যারা তাকে পছন্দ করেন না।
প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে তিনি সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি বিরোধী দলের রাজনীতিক ও কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিকেও আক্রমণ করেন। তবে পুরো সময়জুড়ে তার বক্তব্যে রসিকতা ও হাস্যরসের উপস্থিতিও ছিল।
‘গুলি নয়, বিতর্কেই মতপার্থক্যের সমাধান’
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল ট্রাম্পের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে বক্তব্য। তিনি বলেন, মতপার্থক্যের সমাধান গুলির মাধ্যমে নয়, বরং খোলামেলা ও প্রাণবন্ত বিতর্কের মাধ্যমে হওয়া উচিত।

ট্রাম্পের বক্তব্যে উঠে আসে, কোনো অস্ত্রধারী ব্যক্তি যেন সহিংসতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিবেশ বদলে দিতে না পারে। কয়েক মাস আগের গুলির ঘটনার প্রেক্ষাপটে তার এই মন্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পায়।
গুলির ঘটনার পর এবার কঠোর নিরাপত্তা
আগের আয়োজনটি গুলির ঘটনার কারণে মাঝপথে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবার তাই নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অনেক বেশি কড়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিতির সংখ্যাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়।
এবার প্রায় ৭০০ মানুষ নৈশভোজে অংশ নেন। আগের আয়োজনে এই সংখ্যা ছিল দুই হাজারের বেশি। অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশের কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়।
অতিথিদের একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাই করা হয়। পরিচয়পত্র ও নির্ধারিত সংকেত পরীক্ষা করার পর তাদের হাতে বিশেষ পরিচয়বন্ধনী দেওয়া হয়। একপর্যায়ে অতিথিদের দুই নিরাপত্তারক্ষীর পাশ দিয়ে এক সারিতে হেঁটে যেতে দেখা যায়।
গুলির ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাকে সম্মান
অনুষ্ঠানে কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনায় দায়িত্ব পালন করা মার্কিন গোপন নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তা ভিক্টর গনজালেজকে সম্মাননা দেন ট্রাম্প।
গুলির সময় তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনুষ্ঠানে ট্রাম্প নিজে সম্মাননা গ্রহণকারীদের সঙ্গে হাত মেলান।

পুরস্কার পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একটি প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্রের সাংবাদিকেরাও ছিলেন। সাবেক অর্থকেলেঙ্কারিতে জড়িত অর্থপতি জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য তাদের কাজও পুরস্কৃত হয়।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের টানাপোড়েন অব্যাহত
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। নৈশভোজের আগের সপ্তাহেও কয়েকটি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সম্প্রচার অনুমতি বাতিলের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এসব নেটওয়ার্ক তার নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার না করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ফলে সংবাদদাতা সমিতির এই নৈশভোজকে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হোয়াইট হাউস ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যকার চলমান টানাপোড়েনেরও একটি প্রকাশ্য মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
আবারও ক্ষমতায় ফেরার ইঙ্গিত ট্রাম্পের
নৈশভোজে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে নিয়ে আরও একটি রসিকতা করেন। তিনি বলেন, তিনি আর প্রেসিডেন্ট না থাকলে সংবাদশিল্প নাকি সংকটে পড়বে, কারণ তখন তাকে নিয়ে সংবাদ করার মতো কিছু থাকবে না।
এরপর তিনি ‘ট্রাম্প ২০২৮’ লেখা একটি টুপি পরে আবারও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইঙ্গিত দেন। তার এই আচরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকের জন্য যেমন হাস্যরসের বিষয় হয়ে ওঠে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করে।
সব মিলিয়ে এবারের নৈশভোজে ছিল হাসি, রাজনৈতিক কটাক্ষ, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিরোধ এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের পক্ষে বক্তব্য। কয়েক মাস আগের সহিংসতার ক্ষত পেরিয়ে অনুষ্ঠানটি আবারও ফিরে আসার মধ্য দিয়ে একটি বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে—গণতান্ত্রিক সমাজে মতের পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্যের জবাব সহিংসতা নয়, বিতর্ক ও মুক্ত মতপ্রকাশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















