১২:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
শান্তৌ কেন ব্যর্থ, শেনঝেনের সাফল্যের গল্পে চীনের অর্থনীতির বড় শিক্ষা সারনাথ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়, ভারতের ৪৫তম ঐতিহাসিক স্থাপনা পোষ্যবান্ধব বাসার খোঁজ কমেছে ৫৪ শতাংশ, আইন বদলের পর বদলেছে ভাড়াটিয়াদের আচরণ ক্যালিফোর্নিয়ার সৈকতে সি লায়নকে লাথি, তদন্তে মার্কিন ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ভারতের মাটিতে পিরেলির ২০২৭ দিনপঞ্জি, এক ফ্রেমে ভারতীয় নারীর বহুরূপী সৌন্দর্য সানস্ক্রিনে ক্যানসার হয়—ভুয়া দাবিতে বাড়ছে উদ্বেগ বার্লিনে সমকামী অধিকার উৎসবের কাছে গাড়িচাপা, নিহত ১ আহত ১৬ এক সপ্তাহের কাজেই বদলে গেল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ভাবনা পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে ১৪ প্রশ্ন, পুরোনো সমীক্ষায় ৫০০০০ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় শঙ্কা জুলাইয়ের পূর্ণিমায় আকাশজুড়ে ‘বাক মুন’, ২৯ জুলাই দেখা যাবে দারুণ চাঁদের দৃশ্য

নিউইয়র্কের স্কুলে মানবাকৃতির রোবট, শিক্ষকদের তীব্র আপত্তি: ‘শ্রেণিকক্ষে মানুষের বিকল্প যন্ত্র নয়’

নিউইয়র্কের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শেখানোর কাজে মানবাকৃতির রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী চালুর উদ্যোগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, শ্রেণিকক্ষে মানুষের মতো দেখতে যন্ত্র বসিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকেও এই উদ্যোগকে সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল নয় বলে সমালোচনা করেছেন।

নিউইয়র্কের সালামানকা উচ্চবিদ্যালয়ে আগামী শরৎ মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে একটি মানবাকৃতির রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাসহকারী ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদ্যালয়টি নিউইয়র্কের সেনেকা জাতির অ্যালেগানি ভূখণ্ডে অবস্থিত। শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তৈরি করাই এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

৫৭ হাজার ৫৯০ ডলারের রোবট

জেলার পক্ষ থেকে ‘স্যালি’ নামের মানবাকৃতির রোবটটি কেনা হয়েছে। এর জন্য ব্যয় হয়েছে ৫৭ হাজার ৫৯০ ডলার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোবটটি একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করবে এবং যেসব শিক্ষার্থীর সুযোগ থাকবে, তারা দিন-রাত যেকোনো সময় এর সহায়তা নিতে পারবে।

রোবটটির মাধ্যমে ব্যক্তিভেদে শেখার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিক কথোপকথন, মুখের অভিব্যক্তি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো বৈশিষ্ট্যও এতে রয়েছে।

Humanoid Robot Is Coming To Upstate New York School Classroom

তবে প্রযুক্তির এই অভিনব ব্যবহারই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষকদের উদ্বেগ, যন্ত্রটি দেখতে মানুষের মতো হলেও এটি কখনোই একজন শিক্ষকের মানবিক বিচারবোধ, সহমর্মিতা ও দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।

শিক্ষকদের প্রশ্ন, শ্রেণিকক্ষে রোবট কেন

সালামানকা শিক্ষক সমিতির সভাপতি লেসি পিহলব্লাড বলেছেন, শিক্ষকদের প্রধান উদ্বেগ শুধু রোবটের উপস্থিতি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত তথ্যনিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়েও।

শিক্ষার্থীদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, কোথায় সংরক্ষণ করা হবে এবং রোবটের মাধ্যমে কথোপকথন বা অন্যান্য কার্যক্রম ধারণ করা হবে কি না—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর চাচ্ছেন শিক্ষকরা।

শিক্ষকদের পক্ষ থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমটি কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রেখে আরও বেশি শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আলোচনায় যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পিহলব্লাডের মতে, বিদ্যালয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার পরিবর্তে তাদের বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, আলোচনা ও পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ বাড়ানো বেশি জরুরি।

‘শিক্ষায় দরকার আরও মানবিক সম্পর্ক’

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের শিক্ষক সংগঠনের নেতারাও এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, শিক্ষকরা প্রযুক্তিবিরোধী নন। কিন্তু শিশুদের জন্য কোনো প্রযুক্তি সত্যিই উপকারী কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আগে খুঁজে দেখা দরকার।

San Diego robot inventor preserves indigenous languages while inspiring  next generation

তাদের মতে, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে শুধু পাঠ্যবই শেখে না। তারা সহপাঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, মতবিরোধ সামলাতে শেখে, অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে এবং ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে পরিণত হয়। এসব শেখানোর ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি উপস্থিতির গুরুত্ব অনেক বেশি।

মানুষের মতো দেখতে একটি যন্ত্র যদি সেই মানবিক সম্পর্কের অনুকরণ করতে শুরু করে, তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।

আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন

রোবট চালুর পরিকল্পনাটি নিয়ে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও গভীর। সালামানকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। এমন একটি বিদ্যালয়কে কেন মানবাকৃতির রোবট পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের একজন বিকল্প শিক্ষক সিয়েরা মে আব্রামসের বক্তব্য, আদিবাসী শিশুদের আবারও নতুন কোনো পরীক্ষার অংশ বানানো হচ্ছে কি না, সেটি ভাবা দরকার।

তার মতে, অতীতে আদিবাসী শিশুদের আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর কারণে বহু পরিবার যে গভীর মানসিক ক্ষত বহন করছে, তার প্রভাব এখনো শেষ হয়নি। সেই ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে একটি আদিবাসী অধ্যুষিত বিদ্যালয়ে এমন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সেনেকা জাতির সদস্য অ্যালিসন ব্রাউনও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারের সঙ্গে অতীতের আদিবাসী আবাসিক বিদ্যালয়ের স্মৃতি ও বেদনাদায়ক ইতিহাসের যোগ রয়েছে। ফলে নতুন এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমকে কেউ কেউ পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হিসেবেও দেখছেন।

Robots won't replace teachers but could help with other school roles

প্রযুক্তি থাকবে, তবে শিক্ষককে সরিয়ে নয়

রোবট তৈরির প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াই লক্ষ্য।

শিক্ষকেরাও বলছেন, প্রযুক্তি শিক্ষার সহায়ক হতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা হবে এবং কোথায় তার সীমা টানা হবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার।

কারণ একটি যন্ত্র তথ্য দিতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে কিংবা কথোপকথনের অনুকরণ করতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর আচরণে পরিবর্তন, মানসিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা বা সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা বুঝতে একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকের যে মানবিক বিচারবোধ দরকার, সেটি কেবল যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগ

নিউইয়র্কের শিক্ষা কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং রোবটকে এমন কোনো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, যা প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের দায়িত্বের মধ্যে থাকা উচিত—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, প্রযুক্তি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে পারে। কিন্তু নিরাপদ ও কার্যকর শিক্ষার জন্য মানুষের বিচারবোধ এবং জবাবদিহির জায়গা কোনো যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।

New York School District Begins Bold Humanoid Robot Classroom Test

রোবটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই বড় পরীক্ষা

সালামানকার এই উদ্যোগ শুধু একটি বিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম নয়; এটি ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে।

শিক্ষার্থীদের শেখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট কতটা ব্যবহার করা হবে, আর কোন পর্যায়ে মানুষের উপস্থিতিই অপরিহার্য থাকবে—এই সীমারেখা এখন নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের মতো কথা বলা ও আচরণ করা যন্ত্রও তত বাস্তব হয়ে উঠছে। কিন্তু শিক্ষার মূল ভিত্তি শুধু তথ্য দেওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মমতা, মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের আস্থা।

সালামানকা উচ্চবিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু একটি রোবটের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তি ও মানবিকতার মধ্যে কোন ভারসাম্য রাখা হবে—সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

শান্তৌ কেন ব্যর্থ, শেনঝেনের সাফল্যের গল্পে চীনের অর্থনীতির বড় শিক্ষা

নিউইয়র্কের স্কুলে মানবাকৃতির রোবট, শিক্ষকদের তীব্র আপত্তি: ‘শ্রেণিকক্ষে মানুষের বিকল্প যন্ত্র নয়’

১০:৪১:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

নিউইয়র্কের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শেখানোর কাজে মানবাকৃতির রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী চালুর উদ্যোগ ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, শ্রেণিকক্ষে মানুষের মতো দেখতে যন্ত্র বসিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকেও এই উদ্যোগকে সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল নয় বলে সমালোচনা করেছেন।

নিউইয়র্কের সালামানকা উচ্চবিদ্যালয়ে আগামী শরৎ মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে একটি মানবাকৃতির রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাসহকারী ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদ্যালয়টি নিউইয়র্কের সেনেকা জাতির অ্যালেগানি ভূখণ্ডে অবস্থিত। শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তৈরি করাই এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

৫৭ হাজার ৫৯০ ডলারের রোবট

জেলার পক্ষ থেকে ‘স্যালি’ নামের মানবাকৃতির রোবটটি কেনা হয়েছে। এর জন্য ব্যয় হয়েছে ৫৭ হাজার ৫৯০ ডলার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোবটটি একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করবে এবং যেসব শিক্ষার্থীর সুযোগ থাকবে, তারা দিন-রাত যেকোনো সময় এর সহায়তা নিতে পারবে।

রোবটটির মাধ্যমে ব্যক্তিভেদে শেখার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিক কথোপকথন, মুখের অভিব্যক্তি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো বৈশিষ্ট্যও এতে রয়েছে।

Humanoid Robot Is Coming To Upstate New York School Classroom

তবে প্রযুক্তির এই অভিনব ব্যবহারই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষকদের উদ্বেগ, যন্ত্রটি দেখতে মানুষের মতো হলেও এটি কখনোই একজন শিক্ষকের মানবিক বিচারবোধ, সহমর্মিতা ও দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।

শিক্ষকদের প্রশ্ন, শ্রেণিকক্ষে রোবট কেন

সালামানকা শিক্ষক সমিতির সভাপতি লেসি পিহলব্লাড বলেছেন, শিক্ষকদের প্রধান উদ্বেগ শুধু রোবটের উপস্থিতি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত তথ্যনিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়েও।

শিক্ষার্থীদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, কোথায় সংরক্ষণ করা হবে এবং রোবটের মাধ্যমে কথোপকথন বা অন্যান্য কার্যক্রম ধারণ করা হবে কি না—এসব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর চাচ্ছেন শিক্ষকরা।

শিক্ষকদের পক্ষ থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমটি কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রেখে আরও বেশি শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আলোচনায় যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পিহলব্লাডের মতে, বিদ্যালয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার পরিবর্তে তাদের বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, আলোচনা ও পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ বাড়ানো বেশি জরুরি।

‘শিক্ষায় দরকার আরও মানবিক সম্পর্ক’

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের শিক্ষক সংগঠনের নেতারাও এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য, শিক্ষকরা প্রযুক্তিবিরোধী নন। কিন্তু শিশুদের জন্য কোনো প্রযুক্তি সত্যিই উপকারী কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আগে খুঁজে দেখা দরকার।

San Diego robot inventor preserves indigenous languages while inspiring  next generation

তাদের মতে, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে শুধু পাঠ্যবই শেখে না। তারা সহপাঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, মতবিরোধ সামলাতে শেখে, অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে এবং ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে পরিণত হয়। এসব শেখানোর ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি উপস্থিতির গুরুত্ব অনেক বেশি।

মানুষের মতো দেখতে একটি যন্ত্র যদি সেই মানবিক সম্পর্কের অনুকরণ করতে শুরু করে, তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।

আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন

রোবট চালুর পরিকল্পনাটি নিয়ে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও গভীর। সালামানকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। এমন একটি বিদ্যালয়কে কেন মানবাকৃতির রোবট পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের একজন বিকল্প শিক্ষক সিয়েরা মে আব্রামসের বক্তব্য, আদিবাসী শিশুদের আবারও নতুন কোনো পরীক্ষার অংশ বানানো হচ্ছে কি না, সেটি ভাবা দরকার।

তার মতে, অতীতে আদিবাসী শিশুদের আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর কারণে বহু পরিবার যে গভীর মানসিক ক্ষত বহন করছে, তার প্রভাব এখনো শেষ হয়নি। সেই ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে একটি আদিবাসী অধ্যুষিত বিদ্যালয়ে এমন প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সেনেকা জাতির সদস্য অ্যালিসন ব্রাউনও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারের সঙ্গে অতীতের আদিবাসী আবাসিক বিদ্যালয়ের স্মৃতি ও বেদনাদায়ক ইতিহাসের যোগ রয়েছে। ফলে নতুন এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমকে কেউ কেউ পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হিসেবেও দেখছেন।

Robots won't replace teachers but could help with other school roles

প্রযুক্তি থাকবে, তবে শিক্ষককে সরিয়ে নয়

রোবট তৈরির প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়াই লক্ষ্য।

শিক্ষকেরাও বলছেন, প্রযুক্তি শিক্ষার সহায়ক হতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা হবে এবং কোথায় তার সীমা টানা হবে, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার।

কারণ একটি যন্ত্র তথ্য দিতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে কিংবা কথোপকথনের অনুকরণ করতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর আচরণে পরিবর্তন, মানসিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা বা সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা বুঝতে একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকের যে মানবিক বিচারবোধ দরকার, সেটি কেবল যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগ

নিউইয়র্কের শিক্ষা কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং রোবটকে এমন কোনো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, যা প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের দায়িত্বের মধ্যে থাকা উচিত—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অবস্থান হলো, প্রযুক্তি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে পারে। কিন্তু নিরাপদ ও কার্যকর শিক্ষার জন্য মানুষের বিচারবোধ এবং জবাবদিহির জায়গা কোনো যন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।

New York School District Begins Bold Humanoid Robot Classroom Test

রোবটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই বড় পরীক্ষা

সালামানকার এই উদ্যোগ শুধু একটি বিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম নয়; এটি ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে।

শিক্ষার্থীদের শেখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট কতটা ব্যবহার করা হবে, আর কোন পর্যায়ে মানুষের উপস্থিতিই অপরিহার্য থাকবে—এই সীমারেখা এখন নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের মতো কথা বলা ও আচরণ করা যন্ত্রও তত বাস্তব হয়ে উঠছে। কিন্তু শিক্ষার মূল ভিত্তি শুধু তথ্য দেওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মমতা, মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের আস্থা।

সালামানকা উচ্চবিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু একটি রোবটের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তি ও মানবিকতার মধ্যে কোন ভারসাম্য রাখা হবে—সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।